বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অস্ত্র এখন শুধু সাম্বা ফুটবল নয়, প্রযুক্তিও। মাঠে খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দিতে কার্লো আনচেলত্তিকে এখনো দেখা যায় চিরচেনা ট্যাকটিক্যাল বোর্ড হাতে। তবে সেই দৃশ্যের আড়ালে ব্রাজিলের প্রস্তুতিতে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন, টাচস্ক্রিন এবং আরও নানা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।
বিশ্বকাপে দলের প্রতিটি প্রস্তুতি আরও নিখুঁত করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে ব্রাজিল। অনুশীলন থেকে শুরু করে ম্যাচ চলাকালীন বিশ্লেষণ, এমনকি খেলোয়াড়দের রিকভারি—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি এখন কোচিং স্টাফের অন্যতম ভরসা।
ব্রাজিলের অনুশীলন নিয়মিত ড্রোন দিয়ে ধারণ করা হয়। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কোচিং স্টাফ খেলোয়াড়দের অবস্থান, চলাফেরা এবং শরীরের ভঙ্গিমায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনেন। ম্যাচের সময়ও আনচেলত্তির বিশ্লেষক দল ভিডিও ধারণ করে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দ্রুত সম্পাদনা করে খেলোয়াড়দের দেখায়। বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে নির্দেশনা দিতে কোচ ব্যবহার করেন টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোচিং স্টাফ দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুলও ব্যবহার করছে। একটি ফিফার, অন্যটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) এক স্পনসরের দেওয়া।
ফিজিওলজিস্ট গিলিয়ের্মে পাসোস জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করা এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ। তিনি বলেন, ‘ধরুন আমি আমাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করতে চাই। সবচেয়ে বেশি দৌড়ানো তিনজন খেলোয়াড় কারা? এই তথ্য আগেই সিস্টেমে থাকবে, কারণ আগের ম্যাচ থেকেই দলটিকে ট্র্যাক করা হয়েছে। আমি দেখতে পারব গোলগুলো কোথা থেকে এসেছে কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে তাদের ট্যাকটিক্যাল ফরমেশন কী ছিল। আমি শুধু টুলটিতে নির্দেশনা লিখব, আর সেটি সঙ্গে সঙ্গে সেই ট্যাকটিক্যাল ফরমেশনের ছবি দেখিয়ে দেবে। আগে এই তথ্য পেতে আমাকে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে ফিল্টার করতে হতো, অনেক সময় স্প্রেডশিটও ব্যবহার করতে হতো। এখন একটি কমান্ডেই সহজভাবে সব তথ্য পেয়ে যাচ্ছি।’
তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকেও ভুল বলে উল্লেখ করেন পাসোস, ‘অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সব বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেয়। আসলে তা নয়। আমরা প্রযুক্তিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং কাজকে সহজ ও দ্রুত করার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করি।’
ফিফার এই এআই প্ল্যাটফর্মটি বিশ্বকাপের সব দলের জন্য উন্মুক্ত। নির্দিষ্ট প্রশ্নের ভিত্তিতে এটি প্রযুক্তিগত, কৌশলগত ও শারীরিক পারফরম্যান্স-সংক্রান্ত তথ্য, গ্রাফ, সারণি এবং ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভিডিও সরবরাহ করে। আনচেলত্তির সহকারী ও বিশ্লেষকেরা এসব তথ্য সংগ্রহ করে কোচের কাছে উপস্থাপন করেন। পরে সেগুলো ম্যাচ-পূর্ব সভা কিংবা ব্যক্তিগত আলোচনায় খেলোয়াড়দের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য তাদের নিজস্ব পারফরম্যান্স এবং যাদের বিপক্ষে খেলবেন, সেই প্রতিপক্ষকে নিয়ে আলাদা ভিডিও প্রস্তুত করা হয়।
শুধু কৌশলগত বিশ্লেষণ নয়, খেলোয়াড়দের শারীরিক পরিচর্যাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে ব্রাজিল। অনুশীলনের সময় জিপিএস ডিভাইসের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের দৌড়ের দূরত্ব ও গতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেই তথ্য পেশির ক্লান্তির উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে অনুশীলনের মাত্রা নির্ধারণ করেন ফিটনেস কোচ ও ফিজিওলজিস্টরা।
ঘুমের সময় ও মান পর্যবেক্ষণে খেলোয়াড়রা বিশেষ আংটি বা ব্রেসলেট ব্যবহার করেন, যার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোচিং স্টাফের কাছে পৌঁছে যায়। পেশির পুনরুদ্ধারে ব্যবহৃত হচ্ছে বরফ, কম্প্রেশন বুট এবং শিফটওয়েভ নামের বিশেষ কম্পন-চেয়ার। আর চোটের চিকিৎসায় রয়েছে লেজার, আলট্রাসাউন্ড, শকওয়েভ ও টেরাথেরাপির মতো আধুনিক প্রযুক্তি।
প্রযুক্তির এই সমন্বিত ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রোববার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টায় নিউইয়র্কয়ের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের বিপক্ষে খেলতে নামবে ব্রাজিল।


