বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় মঞ্চে লড়াই। কিন্তু এই ঝলমলে টুর্নামেন্টের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কঠিন বাস্তবতা; শরীরের পাশাপাশি মানসিক চাপেরও ভয়াবহ বোঝা। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সেই দিকটিই সামনে এনেছেন সাবেক পেশাদার ফুটবলার থেকে চিকিৎসা গবেষক হয়ে ওঠা ভিনসেন্ট গুটবার্জ। তিনি একসময় ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে পেশাদার ফুটবল খেলেছেন এবং ২০০৭ সালে খেলা ছাড়ার পর চিকিৎসা গবেষণায় যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক পেশাদার ফুটবলারদের ফেডারেশন আইএফপিআরও–এর মেডিকেল ডিরেক্টর এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির মানসিক স্বাস্থ্য কর্মগোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ফুটবলাররা কোনো ‘সুপারহিরো’ নন। তারা সাধারণ মানুষের মতোই শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন। ইনজুরি যেমন পরিচিত সমস্যা, তেমনি মানসিক চাপও তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিজ্ঞানীর সতর্কবার্তা: চাপের মধ্যে খেলাই বড় ঝুঁকি
গুটবার্জ সতর্ক করে বলেন, “বিশ্বকাপে খেলার আনন্দের পাশাপাশি চাপও প্রচণ্ড। খেলোয়াড় মূল একাদশে আছে নাকি বেঞ্চে, দল জিতছে নাকি হারছে; এসবই মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। তার মতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর বিশ্রামের অভাব। খেলোয়াড়দের খুব দ্রুত ক্লাব দলে ফিরতে হয়, অনেক সময় এক-দুই সপ্তাহের বেশি ছুটি মেলে না। ফলে দুই মৌসুমের মাঝখানে কার্যত কোনো পূর্ণ রিকভারি থাকে না।
শুধু ম্যাচ নয়, পুরো জীবনেই চাপ
আধুনিক ফুটবলের ম্যাচ সূচি খেলোয়াড়দের শরীর, মন এবং চিন্তার ওপর একসঙ্গে বড় চাপ তৈরি করছে। অনেক সময় সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি ম্যাচ খেলতে হয়, একদিনও বিশ্রাম ছাড়াই। ২০২৪ সালে আইএফপিআরও এবং বিভিন্ন লিগ ফিফাকে অনুরোধ জানিয়েছিল, টুর্নামেন্টের সময়সূচি পরিবর্তন করে খেলোয়াড়দের জন্য আরো বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করতে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ, যা ছুটির সময়েও খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রভাবিত করে।
মানসিক সমস্যা কতটা সাধারণ?
গবেষণায় মূলত খেলোয়াড়দের মানসিক ‘লক্ষণ’ দেখা হয়—যেমন দুশ্চিন্তা, খারাপ চিন্তা বা আচরণ। নির্দিষ্ট মানসিক রোগ নির্ণয় করা কঠিন, কারণ তা সময়সাপেক্ষ।
তবে দীর্ঘ গবেষণায় কিছু স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে— • ইনজুরি ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে • মানসিক চাপ ইনজুরির ঝুঁকি বাড়ায় • বড় ইনজুরি খেলোয়াড়দের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা • খারাপ পারফরম্যান্সও মানসিক চাপে বড় ভূমিকা রাখে
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান ট্যাবু
বিশ্বজুড়েই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো লজ্জা ও ভয় কাজ করে। ইউরোপে কিছু উন্নতি হলেও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক জায়গায় এখনো এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। খেলোয়াড়রা শারীরিক ইনজুরি নিয়ে সহজে কথা বললেও, ডিপ্রেশন বা উদ্বেগ নিয়ে এখনো খোলাখুলি কথা বলতে ভয় পান। অনেকের ভয় থাকে; কোচ জানলে তারা দলে জায়গা হারাতে পারেন।
পেশাদার ফুটবলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন ভিনসন গুতেবার
পরিবর্তনের প্রয়োজন কোথায়?
গুটবার্জ মনে করেন, পরিবর্তনের জন্য দুই দিকেই কাজ করা জরুরি— • খেলোয়াড় ও কোচদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা (bottom-up) • ফেডারেশন পর্যায়ে মেডিকেল টিমে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা (top-down)
আইএফপিআরও-এর উদ্যোগ
২০১৮ সালে আইএফপিআরও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করে। সেখানে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণের পর খেলোয়াড়দের আচরণ ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
আলাদা করে অনুশীলন করানো নিয়েও উদ্বেগ
অনেক ক্লাবে দেখা যায়, নতুন কোচ এলে কিছু খেলোয়াড়কে আলাদা করে অনুশীলন করতে বলা হয়। গুটবার্জ এটিকে মানসিকভাবে ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তার মতে, সামাজিক সমর্থন খেলোয়াড়দের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে আলাদা করে রাখা মানসিক চাপ বাড়ায়, যা অন্য কোনো পেশায় সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।
খেলার বাইরে এক নীরব বাস্তবতা
বিশ্বকাপ শুধু শারীরিক দক্ষতার প্রতিযোগিতা নয়—এটি মানসিক চাপ, বিশ্রামের অভাব এবং সামাজিক চাপে ভরা এক কঠিন পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ফুটবলে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য রক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
*ন্যাচার ডটকম অবলম্বনে








