লিওনেল মেসিকে মাঠে দেখলে অনেক সময় মনে হয়, ফুটবল খেলাটা যেন তার কাছে খুব সহজ। বিশ্বকাপের মতো সবচেয়ে বড় মঞ্চেও তাকে অনেক সময় ধীরে হাঁটতে দেখা যায়। মনে হয়, তিনি নিজের মতো করে অপেক্ষা করছেন সঠিক মুহূর্তের জন্য। টুর্নামেন্টে মাঠে তার মোট চলাফেরার ৬৪ শতাংশই ছিল হাঁটা, যা অন্য যে কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই ধীরগতির আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির মতো বয়সি কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড় এর আগে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টাইন এ মহাতারকা প্রমাণ করে চলেছেন, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনি এখনো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ধ্বংস করে দিতে পারেন।
আধুনিক ফুটবল দিন দিন আরও বেশি শারীরিক শক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। খেলোয়াড়দের আগের চেয়ে বেশি দৌড়াতে হয়, বেশি চাপ দিতে হয়। এমন সময়ে মেসি কীভাবে এখনো নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে যাচ্ছেন—এর উত্তর খুঁজতে হলে বলের দিকে নয়, তাকাতে হবে শুধু মেসির দিকে।
তখন দেখা যাবে, মাঠে তার বেশিরভাগ সময় কাটে হয় দাঁড়িয়ে থেকে, নয়তো হেঁটে। একসময় মেসি ছিলেন বিশ্বের সেরা ড্রিবলার, পাসদাতা ও ফিনিশার। এখন তিনি ফুটবলের সবচেয়ে কার্যকর ‘হাঁটা’ খেলোয়াড়ও।
২০২৬ বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের শক্তি সঠিকভাবে ধরে রাখা এবং আক্রমণের জন্য নিখুঁত মুহূর্ত বেছে নেওয়া।
মেসি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি ম্যাচের খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজের সেরাটা দিয়ে পার্থক্য গড়ে দেন। আর তার সতীর্থরা নিজেদের সর্বোচ্চ শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে সেই শক্তি ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করেন।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার পথ অতিক্রম করেছেন। এর মধ্যে ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার বা ৬৪ শতাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন ‘জোন ওয়ান’ গতিতে। অর্থাৎ ঘণ্টায় ০ থেকে ৭ কিলোমিটার গতিতে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় শেষ ষোলোর ম্যাচে একটি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটে যখনই মেসি দৌড় শুরু করেছেন, তখন সময় হিসাব করা হয়।
সেই সময়ে মেসির মোট দৌড়ানোর সময় ছিল মাত্র ৫১ সেকেন্ড।
পুরো ৯০ মিনিটের ম্যাচে এই হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ মিনিটের মতো। অবশ্য এটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক পরিমাপ নয়, কারণ প্রতিটি ম্যাচ ও প্রতিপক্ষ অনুযায়ী খেলোয়াড়দের পরিশ্রমের ধরন বদলে যায়। তবে এই পরিসংখ্যান বোঝায়, বিশ্বকাপে মেসি কতটা হিসাব করে নিজের শক্তি ব্যবহার করছেন।
গ্রুপ পর্বে বিশ্বকাপের ৬১৮ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে মেসি ছিলেন গোলের দিক থেকে সবার ওপরে। কিন্তু প্রতি ৯০ মিনিটে দৌড়ানোর দূরত্বের হিসাবে ছিলেন সবার শেষে।
অর্থাৎ এমন এক খেলোয়াড়, যিনি সবচেয়ে কম শারীরিক পরিশ্রম করেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন। কারণ তার খেলার ধরন তৈরি হয়েছে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার ওপর।
তবে মেসির খেলার ধরনে এই হাঁটাহাঁটি নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালে ক্ল্যাঙ্ক মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, শৈশবের ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে দৌড়ের অনুশীলনের সময় তিনি ‘গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতেন’।
আরেকটি পরিসংখ্যানেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচ শেষে মেসির উচ্চগতির দৌড়ের সংখ্যা ছিল ২৯৮টি। অথচ অন্য শীর্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা এই সংখ্যায় অনেক এগিয়ে ছিলেন।
হ্যারি কেইন করেছেন ৬০০টি উচ্চগতির দৌড়, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৫১৪টি, উসমান দেম্বেলে ৪৭৭টি, মিকেল ওইয়ারসাবাল ৪৬১টি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে ৩৩৬টি। শুধু আর্লিং হালান্ড ৩১৪টি নিয়ে মেসির কাছাকাছি ছিলেন।
শেখ পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় আছে, তিন মাস পর পর জানাতে হবে: শফিকুল
কিন্তু মেসির খেলার রহস্য এখানেই। তিনি জানেন কখন দৌড়াতে হবে এবং কখন অপেক্ষা করতে হবে। মেসির হাঁটা অলসতার লক্ষণ নয়, বরং এটি তার কৌশলের অংশ।
The post বিশ্বকাপে মাঠে ৬৪ শতাংশ সময়ে শুধুই হাঁটছেন মেসি appeared first on ZoomBangla.







