হ্যারি কেইনকে নিয়ে দুইবার মিলেছে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী। আর পর্তুগাল ও রোনালদোকে নিয়ে বলা কথাও ফলতে শুরু করছে। তাই তো এই তান্ত্রিকের প্রেডিকশনে আর্জেন্টিনার জন্য আছে জুজুর ভয়।

গ্যালারিতে হাজারো কণ্ঠের গর্জন, উত্তেজনায় কাঁপছে চারদিক। মাঠে বাইশজন ফুটবলার ছুটছেন একটি বলের পেছনে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এ তো নিছকই একটি খেলা গতি, কৌশল, দক্ষতা আর মানসিক দৃঢ়তার লড়াই।

কেউ তাকে বলে জুজু আবার কেউ বলে তন্ত্র। কেউ বলেন, এটি পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ।

কিন্তু ঘানার ফুটবল সংস্কৃতিতে অনেকে বিশ্বাস করেন, মাঠে শুধু এই এগারোজনই থাকেন না। সেখানে উপস্থিত থাকে আরও কিছু অদৃশ্য, অনির্বচনীয়, রহস্যময় শক্তি।কেউ তাকে বলে জুজু আবার কেউ বলে তন্ত্র। কেউ বলে, এটি পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ। আবার কেউ নিচু গলায় বলে, সব শক্তি আশীর্বাদ বয়ে আনে না, কিছু শক্তি অভিশাপও ডেকে আনে।

ঘানার ফুটবল ইতিহাসে তান্ত্রিক চর্চা বা জুজুর গল্প নতুন নয়। বরং বহু বছর ধরেই এটি আলোচনার, কৌতূহলের, এমনকি বিতর্কের বিষয়। আফ্রিকার বহু দেশে আধ্যাত্মিকতা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, রোগ সবকিছুর মাঝেই সেখানে বিশ্বাসের এক অদৃশ্য জগত কাজ করে। আর ঘানায় সেই বিশ্বাস এসে জড়িয়ে গেছে ফুটবলের সঙ্গে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার দুর্দান্ত রক্ষণভাগের প্রদর্শন নতুন করে এই আলোচনাকে উসকে দেয়। শুধু খেলার ফল নয়, ম্যাচের আগে এক স্বঘোষিত ঘানাইয়ান আধ্যাত্মিক গুরুর ভবিষ্যদ্বাণীও সবাইকে চমকে দেয়।

কেইন নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না
ম্যাচের আগে ঘানার ঐতিহ্যবাহী পুরোহিত নানা কাকু বনসাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি জানেন কীভাবে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে থামাতে হবে

ম্যাচের আগে ঘানার ঐতিহ্যবাহী পুরোহিত নানা কাকু বনসাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি জানেন কীভাবে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে থামাতে হবে। তিনি দাবি করেন, অতীতেও নিজের আধ্যাত্মিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছেন এবং এবার দেশের জন্য সেই শক্তি ব্যবহার করবেন। তবে এতে প্রতিপক্ষের কোনো শারীরিক ক্ষতি হবে না শুধু তার কার্যকারিতা কমে যাবে। শুনতে গল্পের মতো লাগলেও কয়েক ঘণ্টা পর মাঠে যেন সেই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেল।বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল ইংল্যান্ড গোল করতে ব্যর্থ হলো। ঘানা তাদের গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিল। ইংল্যান্ডের আক্রমণ বারবার থেমে গেল ঘানার সংগঠিত রক্ষণভাগে। কেইনও নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। যে কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিলেন, সেগুলোও কাজে লাগাতে পারলেন না। তারপর শুরু হলো আলোচনা। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই রসিকতা করে বলতে লাগলেন হয়তো সত্যিই জুজু কাজ করেছে।

রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, গ্যালারিতে থাকা কয়েকজন ঘানাইয়ান সমর্থক সাদা গুঁড়া ছিটাচ্ছেন, কেউ কেউ বিশেষ আচার পালন করছেন। অনেকে বললেন, এ শুধু সমর্থনের প্রকাশ নয়; এর পেছনে আছে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য। এই বিশ্বাসকে বলা হয় জুজু ।

গ্যালারিতে থাকা কয়েকজন ঘানাইয়ান সমর্থক সাদা গুঁড়া ছিটাচ্ছেন
হ্যারি কেইনের ওপর থেকে জাদু তুলে নিয়েছেন ও তিনি গোল করবেন এই কথা বলেন ঘানার তান্ত্রিক বনসাম

এরপরের ম্যাচে হ্যারি কেইনের ওপর থেকে জাদু তুলে নিয়েছেন ও তিনি গোল করবেন এই কথা বলেন ঘানার তান্ত্রিক বনসাম। অদ্ভুত হলেও সত্য, হ্যারি কেন অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে গোল করলেন। তাও একাধিক।

এদিকে গতকাল বেশ অদ্ভুতভাবেই জিতে যায় পর্তুগাল। গোল পান রোনালদো। এদিকে তান্ত্রিক বনসাম বলেছিলেন, সি আর সেভেনের পর্তুগালই জিতবে বিশ্বকাপ। সে পথে সৌভাগ্যক্রমে এগিয়ে গেল তারা।

বেশ অদ্ভুতভাবেই জিতে যায় পর্তুগাল। গোল পান রোনালদো

শুধুই কি ঝড়ে বক মরছে? নাকি এই তান্ত্রিক সত্যিই শক্তিধর। তাহলে তো এবার তাঁর পরবর্তী প্রেডিকশন এক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আর্জেন্টিনার জন্য। কারণ, তিনি বলেছেন কেপ ভার্দে রুখে দেবে এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়রথ আর বাদ পড়বে বিশ্বকাপ থেকে দলটি। তিন তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়া আসলে সোজা কথা নয়। তাই আর্জেন্টিনাকে আসলেই জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন এই ঘানার তান্ত্রিক।

জুজু আসলে কী?

পশ্চিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে জুজু মানেই কালোজাদু নয়। এটি বিশ্বাস, আচার, তাবিজ, মন্ত্র এবং অদৃশ্য শক্তির এক জটিল মিশ্রণ। এর মধ্যে থাকে বিশেষ ভেষজ, রহস্যময় বস্তু, পূর্বপুরুষের শক্তিকে আহ্বান, এমনকি আত্মিক সুরক্ষার চর্চা। ঘানার বহু খেলোয়াড়, সমর্থক এবং ক্লাব কর্মকর্তার বিশ্বাস—

জুজু খেলোয়াড়কে আঘাত থেকে বাঁচাতে পারে।

প্রতিপক্ষের মনোবল দুর্বল করতে পারে।

ভাগ্যকে নিজের দিকে টেনে আনতে পারে।

এমনকি গোলপোস্টকেও যেন অদৃশ্যভাবে বন্ধ করে দিতে পারে।

পশ্চিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে জুজু মানেই কালোজাদু নয়

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ঘানার স্থানীয় ফুটবলে এসব বিশ্বাসের প্রভাব গভীর। প্রচলিত আছে, বড় ম্যাচের আগে কেউ গোপন উপাসনাস্থলে যান। কেউ মাঠে ঢোকার আগে গোলপোস্টে রহস্যময় তরল ছিটান। কেউ ড্রেসিং রুমে তাবিজ লুকিয়ে রাখেন। আরও ভয়ংকর গল্পও আছে। কেউ বলেন, ম্যাচের আগের রাতে নির্জন স্থানে আচার পালন করা হয়। ঢাক বাজে, মন্ত্র পড়া হয়, আর আহ্বান করা হয় অদৃশ্য শক্তিকে। এসব গল্পের সত্যতা যাচাই কঠিন। কিন্তু বিশ্বাসের শক্তি অস্বীকার করা যায় না।

প্রশ্ন হলো জুজু কি সত্যিই কাজ করে? বিজ্ঞানের কাছে এর কোনো প্রমাণ নেই কিন্তু মানুষের মন বড় বিচিত্র। যদি কোনো খেলোয়াড় বিশ্বাস করে একটি তাবিজ তাকে শক্তি দিচ্ছে, তাহলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেতে পারে। আর আত্মবিশ্বাস অনেক সময় খেলার ফল বদলে দেয়।তাহলে কাজ করে কোনটি? তাবিজ, তন্ত্র নাকি বিশ্বাস? হয়তো উত্তরটি এত সরল নয়। বিশ্বকাপ কেবল নব্বই মিনিটের খেলা নয়। এটি সংস্কৃতি, পরিচয়, বিশ্বাস এবং মানসিক শক্তির লড়াই।

স্কোরবোর্ডে আমরা শুধু সংখ্যা দেখি। কিন্তু মাঠের বাইরে থেকে যায় প্রার্থনা, ভয়, বিশ্বাস, তাবিজ, মন্ত্র আর কুসংস্কারের গল্প। হয়তো সেই কারণেই ঘানার ফুটবল এত রহস্যময়। কারণ কখনও কখনও বল শুধু পায়ের সঙ্গে নয় বিশ্বাসের সঙ্গেও গড়ায়।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ঘানা উইকেন্ড

ছবি: ইন্সটাগ্রাম