মার্কেটে গিয়ে নতুন মোবাইল, পোশাক, প্রসাধনী কিংবা কোনো দামি গৃহস্থালি পণ্য কেনার সময় অনেকেরই বেশ আনন্দ লাগে। কিন্তু বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পরই মনে হতে পারে, ঠকে গেছি। এই অনুভূতি খুবই সাধারণ এবং অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে। মনোবিজ্ঞানে একে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স বা বায়ার্স রিমোরস অর্থাৎ ক্রেতার অনুশোচনা বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাধারণত কোনো মানসিক রোগ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। তবে যদি প্রায় প্রতিটি কেনাকাটার পর একই ধরনের উদ্বেগ, অপরাধবোধ বা অস্বস্তি তৈরি হয় এবং তা আপনার মানসিক শান্তি বা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
যে কারণে এমন অনুভূতি হয়
কোনো পণ্য কেনার আগে আমরা সাধারণত অনেক বিকল্প দেখি। একটি বেছে নেওয়ার পর মনে হতে পারে, অন্যটি হয়তো আরও ভালো ছিল। মনোবিজ্ঞানীরা একে ডিসিশন রিগ্রেট বা সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা বলেন।
আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে। কোনো কিছু কেনার পর যদি দেখেন অন্য কেউ একই ধরনের আরও ভালো বা কম দামের পণ্য ব্যবহার করছেন, তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
আবার অনেকেই আবেগের বশে কেনাকাটা করেন। কেনার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা সাময়িক আনন্দ ও উত্তেজনা তৈরি করে। কিন্তু সেই উত্তেজনা কমে গেলে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনেকের মধ্যেই অনুশোচনা তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক চাপও বড় একটি কারণ। দামি কিছু কেনার পর ভবিষ্যতের খরচের কথা মনে পড়লে অনেকের মধ্যে অপরাধবোধ বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
এটি কি মানসিক সমস্যা?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নয়। মাঝে মাঝে এমন অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি প্রায় প্রতিটি কেনাকাটার পর তীব্র অনুশোচনা হয়, সিদ্ধান্ত নিতে ভয় লাগে, অকারণ উদ্বেগ তৈরি হয় বা এসব কারণে আপনার কাজ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে এটি অতিরিক্ত উদ্বেগ, পারফেকশনিজম বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।
দাম ভালোভাবে যাচাই করুন
কোনো পণ্য কেনার আগে একাধিক দোকান বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দাম মিলিয়ে দেখুন। আগে থেকেই পণ্যের আনুমানিক মূল্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে অযথা বেশি দাম দিয়ে কেনার ঝুঁকি কমে। এতে পরে ‘ঠকে গেছি’ ধরনের অনুভূতিও অনেক কম হয়।
বাজারের কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকুন
অনেক বিক্রেতা একটি পণ্যে কম দাম দেখিয়ে অন্য পণ্যে বেশি দাম রাখেন বা ধাপে ধাপে অতিরিক্ত কিছু কিনতে উৎসাহিত করেন। মনোবিজ্ঞানে একে ফুড ইন দ্য ডোর কৌশল বলা হয়। তাই শুধু ছাড় বা অফার দেখে নয়, পুরো কেনাকাটার হিসাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
পণ্য ভালোভাবে যাচাই করুন
কেনার আগে পণ্যের ব্র্যান্ড, উপকরণ, গুণগত মান, মেয়াদ ও ওয়ারেন্টি থাকলে তা ভালোভাবে দেখে নিন। সম্ভব হলে নিজ হাতে পরীক্ষা করুন। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো।
নিজের সিদ্ধান্তকে বিশ্বাস করতে শিখুন
কোনো সিদ্ধান্তই শতভাগ নিখুঁত হয় না। কেনার পর বারবার ভাবার বদলে দেখুন, পণ্যটি আপনার প্রয়োজন পূরণ করছে কি না। অযথা অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের প্রয়োজন ও সামর্থ্যকে গুরুত্ব দিন। এতে সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা অনেকটাই কমে যাবে।
আরও পড়ুন
পরীক্ষার হলে নার্ভাস লাগলে কী করবেন?
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
যদি দেখেন প্রায় প্রতিটি কেনাকাটার পরই তীব্র মানসিক অশান্তি হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধবোধে ভুগছেন, সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন বা এই সমস্যা আপনার কাজ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আরও পড়ুন
জার্সির রং কি সত্যিই ভক্তদের আবেগে প্রভাব ফেলে?
কেনাকাটার পর ‘ঠকে গেছি’ মনে হওয়া খুবই সাধারণ একটি অভিজ্ঞতা। এটি সব সময় মানসিক সমস্যা নয়। তবে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় তুলনা এড়িয়ে চলা সম্ভব।
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে, ভোগ ইন্ডিয়া
এসএকেওয়াই








