বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু মানেই টাইব্রেকারের সম্ভাবনা। ২০২২ সালের আসরে রেকর্ড পাঁচটি ম্যাচ গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে নকআউটে অতিরিক্ত একটি পর্ব যুক্ত হওয়ায় সেই রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও জোরালো।
১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বকাপে হওয়া ৩৫টি টাইব্রেকারে নেওয়া ৩২০টি স্পট-কিকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে সাফল্য-ব্যর্থতার নানা চিত্র।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি স্পট-কিক মিস করার রেকর্ড একসময় ছিল ইংল্যান্ডের। দলটি আটবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। তবে ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় মরক্কোর বিপক্ষে তিনটি স্পট-কিকই নষ্ট করে স্পেন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে স্পেনের মিস করা স্পট-কিকের সংখ্যা নয়। পাঁচটি টাইব্রেকারের মধ্যে চারটিতেই হেরেছে তারা।
অন্যদিকে সবচেয়ে সফল দল আর্জেন্টিনা। সাতটি টাইব্রেকারের মধ্যে ছয়টিতেই জয় পেয়েছে তারা। এর মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালও।
জার্মানি ১৮টির মধ্যে ১৭টি স্পট-কিক সফলভাবে নিয়ে চারটির চারটিতেই জয় পেয়েছে। একই কৃতিত্ব রয়েছে ক্রোয়েশিয়ারও। বিপরীতে জাপান, মেক্সিকো ও রোমানিয়া দুটি করে টাইব্রেকার খেলেও একটিতেও জিততে পারেনি।
বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও প্যারাগুয়ে বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে নেওয়া পাঁচটি করেই স্পট-কিকের সবগুলো সফল করেছে। আর সুইজারল্যান্ড তিনটি সুযোগের একটিও কাজে লাগাতে পারেনি।
ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকায় আছেন মাত্র দুজন ফুটবলার, যারা বিশ্বকাপের তিনটি আলাদা টাইব্রেকারে স্পট-কিক নিয়ে প্রতিবারই সফল হয়েছেন। তারা হলেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ। মেসির একটি সফল স্পট-কিক ছিল ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে।
আরও ২৩ জন খেলোয়াড় দুটি করে স্পট-কিক নিয়ে দুটিতেই সফল হয়েছেন। ইতালির রবার্তো বাজ্জিও তিনটির মধ্যে দুটি সফল করলেও ১৯৯৪ সালের ফাইনালে তার মিস করা স্পট-কিকই শিরোপা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে সবচেয়ে বেশি চারটি স্পট-কিক ঠেকিয়েছেন চার গোলরক্ষক। তারা হলেন ক্রোয়েশিয়ার দানিয়েল সুবাশিচ, ক্রোয়েশিয়ার দোমিনিক লিভাকোভিচ, পশ্চিম জার্মানির হারাল্ড শুমাখার এবং আর্জেন্টিনার সার্হিও গয়কোচেয়া।
একটি টাইব্রেকারে তিনটি স্পট-কিক ঠেকানোর কীর্তি রয়েছে কেবল সুবাশিচ, লিভাকোভিচ ও পর্তুগালের রিকার্দোর। মাত্র চারটি স্পট-কিকের মুখোমুখি হয়ে তিনটি ঠেকানোয় রিকার্দোর সেভের হার সবচেয়ে বেশি, ৭৫ শতাংশ।
শুধু বল ঠেকানোই নয়, মানসিক চাপও বড় ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেস মাত্র একটি স্পট-কিক ঠেকালেও তার মানসিক কৌশল ফরাসি খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, যারা দুই প্রান্তের যেকোনো একদিকে শট নেন, তাদের সফলতার হার মাঝ বরাবর নেওয়া শটের তুলনায় বেশি। ডানদিকে নেওয়া শটের ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বাঁদিকে নেওয়া শটের ৭১ দশমিক ১ শতাংশ সফল হয়েছে। মাঝ বরাবর নেওয়া শটে সফলতার হার ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ।
যদিও মাঝ বরাবর নেওয়া শট কম ঠেকানো হয়, তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার হার সেখানে অনেক বেশি। মাঝ বরাবর নেওয়া শটের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, যেখানে দুই প্রান্তে নেওয়া শটের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
টাইব্রেকারে আগে কিংবা পরে শট নেওয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা পাওয়া যায়নি। আগে শুরু করা দল ১৭টি এবং পরে শুরু করা দল ১৮টি টাইব্রেকারে জয় পেয়েছে।
প্রথম শট নেওয়া খেলোয়াড়দের সফলতার হার সবচেয়ে বেশি, ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শট নেওয়া খেলোয়াড়দের সফলতার হার ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ। চতুর্থ রাউন্ডের প্রথম শট নেওয়া খেলোয়াড়দের সফলতার হার ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং পঞ্চম রাউন্ডে তা ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ পর্যন্ত মাত্র দুটি টাইব্রেকার অতিরিক্ত পর্যায়ে গড়িয়েছে। ষষ্ঠ শট নেওয়া চার খেলোয়াড়ের মধ্যে সফল হয়েছেন দুজন।
সবচেয়ে কম সফল হয়েছেন অষ্টম শট নেওয়া খেলোয়াড়রা, অর্থাৎ চতুর্থ রাউন্ডের দ্বিতীয় শট নেওয়া ফুটবলাররা। তাদের সফলতার হার ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
খেলোয়াড়দের অবস্থানভেদেও পার্থক্য দেখা গেছে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সফলতার হার সবচেয়ে বেশি, ৭৫ শতাংশ। মধ্যমাঠের খেলোয়াড়দের সফলতার হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ৬৫ শতাংশ।
এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের কোনো টাইব্রেকারে কোনো গোলরক্ষক স্পট-কিক নেননি। কারণ কোনো টাইব্রেকারই ষষ্ঠ রাউন্ডের বেশি গড়ায়নি।
ডান কিংবা বাঁ পায়ে শট নেওয়ার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। ডান পায়ে নেওয়া শটের সফলতার হার ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাঁ পায়ে ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে মোট স্পট-কিকের ৮০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে ডান পায়ে।
টাইব্রেকারের জন্য শেষ মুহূর্তে বদলি নামানোর কৌশলও খুব বেশি সফল হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের শেষ পাঁচ মিনিটে মাঠে নেমে টাইব্রেকারে অংশ নেওয়া পাঁচ খেলোয়াড়ের মধ্যে মাত্র দুজন গোল করতে পেরেছেন।
২০২২ সালের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে বদলি হিসেবে নেমে আর্জেন্টিনার পাওলো দিবালা সফলভাবে স্পট-কিক নেন। একই আসরে মরক্কোর বিপক্ষে শেষ ষোলোয় শেষ মুহূর্তে নামা মরক্কোর বাদর বেনুন ও স্পেনের পাবলো সারাবিয়া দুজনই স্পট-কিক মিস করেন।
২০০৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ দিকে মাঠে নেমে ইংল্যান্ডের জেমি ক্যারাঘারের শট ঠেকিয়ে দেন রিকার্দো। আর ১৯৮৬ সালে পশ্চিম জার্মানির পিয়েরে লিটবারস্কি শেষ মুহূর্তে নেমে মেক্সিকোর বিপক্ষে সফলভাবে স্পট-কিক নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুনঃ
বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের কথা ভেবে শেষ মুহূর্তে বদলি হিসেবে নামানো একমাত্র গোলরক্ষক নেদারল্যান্ডসের টিম ক্রুল। ২০১৪ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের ১২১তম মিনিটে নেমে তিনি দুটি স্পট-কিক ঠেকিয়ে দলকে জয় এনে দেন। তবে পরের ম্যাচে তিনি বেঞ্চে থাকেন এবং অন্য গোলরক্ষক কোনো শট ঠেকাতে না পারায় টাইব্রেকারে বিদায় নেয় নেদারল্যান্ডস।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
The post বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে কারা জেতে, কী বলছে পরিসংখ্যান? appeared first on ZoomBangla.








