আজকাল অস্ত্র বললেই বন্দুক, ধারালো ছুরি বা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আধুনিক জিনিসের কথা মাথায় আসে। তবে মাটির নিচে পাওয়া প্রাচীন নানা নমুনা থেকে জানা যায়, লাখ লাখ বছর আগেও অস্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। আদিম মানুষের তৈরি সেই অস্ত্রগুলো দেখতে আজকের মতো ছিল না, সেগুলো ছিল বেশ অন্য রকম। তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো অস্ত্র কোনটি?
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন ফিটজহিউয়ের মতে, অন্য কোনো প্রাণীকে আঘাত বা আক্রমণ করার জন্য যা ব্যবহার করা হয়, তাকেই অস্ত্র বলা যায়। মানুষের পূর্বপুরুষেরা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করতে কিংবা শিকারের জন্য এসব জিনিস ব্যবহার করত।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ক্ষতি করতে পারে এমন যেকোনো জিনিসকেই সরাসরি অস্ত্র বলতে রাজি নন। এ ক্ষেত্রে বস্তুটি কী উদ্দেশ্যে ও কোথায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জানা জরুরি। সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রলফ ওয়ার্মিং জানান, প্রাচীন কোনো জায়গায় অস্ত্রের খোঁজ করার সময় বিশেষজ্ঞরা শিকারের অন্যান্য প্রমাণও মিলিয়ে দেখেন। যেমন সেখানে জবাই করা পশুর হাড় আছে কি না কিংবা অস্ত্র তৈরির জন্য ধারালো হাড়ের কোনো সরঞ্জাম আছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা হয়।
এ ছাড়া জিনিসগুলো কী দিয়ে তৈরি এবং সেগুলোর গায়ে ব্যবহারের কোনো দাগ আছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হয়। এসব দেখেই বোঝা যায়, জিনিসগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মূলত তিনটি আবিষ্কারকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্র বলে মনে করেন। এগুলো হলো—ক্ল্যাকটন বর্শা, শোনিনগেন বর্শা ও নিক্ষেপ করার লাঠি এবং কাথু প্যান ১-এর বর্শার ফলা।
আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ারসুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রলফ ওয়ার্মিং জানান, প্রাচীন কোনো জায়গায় অস্ত্রের খোঁজ করার সময় বিশেষজ্ঞরা শিকারের অন্যান্য প্রমাণও মিলিয়ে দেখেন।
ক্ল্যাকটন বর্শা
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, ক্ল্যাকটন বর্শাটি চার লাখ বছরেরও বেশি পুরোনো। মাটির নিচে ১৫ ইঞ্চি লম্বা একটি বর্শার ফলা পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি আসলে আরও বড় একটি লাঠির অংশ ছিল, যা শিকার করার সময় দুর্ঘটনাবশত ভেঙে গিয়েছিল। অথবা কোনো আচার-অনুষ্ঠান পালনের সময় এটিকে ইচ্ছা করেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এই বর্শাটি তৈরি হয়েছিল ইউ (Yew) গাছের কাঠ দিয়ে। আর কোনো শক্ত হাতিয়ার দিয়ে এর এক প্রান্ত ধারালো করা হয়েছিল। তবে ভেঙে যাওয়া বাকি অংশটি আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৯১১ সালে ইংল্যান্ডের এসেক্সের ক্ল্যাকটন-অন-সি নামে একটি জায়গা থেকে এটি খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে বর্শাটি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে রাখা আছে। এটিই এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো কাঠের বর্শার অংশ।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিশ্বাস, এটি হোমো হাইডেলবার্গেনসিস অথবা নিয়ান্ডারথালরা তৈরি করেছিল। কারণ, আধুনিক মানুষের সবচেয়ে পুরোনো যে জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, তার বয়স প্রায় তিন লাখ বছর। বর্শাটির আকার ও ধরন দেখে বোঝা যায়, এটি মূলত কোনো পশুকে কাছে গিয়ে খোঁচা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো। আর এটি দিয়ে আদিম মানুষেরা দলবদ্ধভাবে শিকার করত।
মানুষ ৪ লাখ বছর আগে প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিল ইংল্যান্ডে, দাবি বিজ্ঞানীদের১৯১১ সালে ইংল্যান্ডের এসেক্সের ক্ল্যাকটন-অন-সি নামে একটি জায়গা থেকে ক্ল্যাকটন বর্শাটি খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে রাখা আছে।
শোনিনগেন বর্শা ও নিক্ষেপ করার লাঠি
১৯৯২ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জার্মানির শোনিনগেন নামে একটি জায়গায় খননকাজ চালিয়ে ২০ থেকে ২৫টির মতো কাঠের অস্ত্র উদ্ধার করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আস্ত ও ভেঙে যাওয়া বর্শা এবং নিক্ষেপ করার লাঠি, যা মূলত স্প্রুস ও পাইন কাঠ দিয়ে তৈরি।
শোনিনগেন গবেষণা জাদুঘরের মতে, এগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সম্পূর্ণ অক্ষত কাঠের অস্ত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী, এই অস্ত্রগুলোর বয়স দুই লাখ থেকে তিন লাখ বছরের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, এগুলো হোমো হাইডেলবার্গেনসিস তৈরি করেছিল।

এরা প্রায় সাত লাখ থেকে দুই লাখ বছর আগে ইউরোপ, আফ্রিকা ও চীনে বাস করত। তবে ২০২৪ সালের একটি নতুন গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই বর্শাগুলো সম্ভবত নিয়ান্ডারথালদের তৈরি।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই বর্শাগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬ ফুট (২ মিটার)। এগুলো ঘোড়ার মতো বড় কোনো প্রাণীকে কাছ থেকে খোঁচা দিতে বা দূর থেকে ছুড়ে মেরে শিকার করার জন্য ব্যবহার করা হতো। অন্যদিকে নিক্ষেপ করার ছোট লাঠিগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৬ ইঞ্চি (৬৫ সেন্টিমিটার)।
শোনিনগেনের এই অস্ত্রগুলো ঘোড়ার হাড়ের সঙ্গে খুঁজে পাওয়া যায়। আদিম মানুষেরা আগুন ব্যবহার করে বর্শাগুলোকে ধারালো, শক্ত ও কালো করত। জিনিসগুলোকে বেশ নিখুঁত ও উন্নত উপায়ে তৈরি করা হয়েছিল। এই অস্ত্রগুলোই প্রমাণ করে যে আদিম মানুষেরা কাঠ ও চারপাশের নানা উপাদান সম্পর্কে বেশ ভালো জানত। আর দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে তারা শিকারের আলাদা কৌশল ব্যবহার করত।
৪ লাখ ৩০ হাজার বছরের পুরোনো প্রাচীনতম লাঠির খোঁজেশোনিনগেন গবেষণা জাদুঘরের মতে, এগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সম্পূর্ণ অক্ষত কাঠের অস্ত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী, এই অস্ত্রগুলোর বয়স দুই লাখ থেকে তিন লাখ বছরের মধ্যে।
কাথু প্যান ১-এর বর্শার ফলা
পাথরের তৈরি ধারালো ফলাকে কোনো কাঠের লাঠির মাথায় বেঁধে বর্শা বানানোর চল আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ায় প্রায় দুই থেকে তিন লাখ বছর আগে শুরু হয়েছিল। ধারণা করা হতো, এগুলো নিয়ান্ডারথাল বা হোমো স্যাপিয়েন্সরা তৈরি করেছিল।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কাথু প্যান নামে একটি জায়গায় প্রায় পাঁচ লাখ বছর পুরোনো কিছু পাথরের ফলা পাওয়া গেছে। এগুলোর কিনারায় ক্ষয়ের দাগ রয়েছে। গোড়ার আকৃতি দেখে বোঝা যায়, এগুলো লাঠির মাথায় জোড়া দেওয়া ছিল। এই ফলাগুলো নিয়ান্ডারথাল বা হোমো স্যাপিয়েন্সদের যুগেরও আগের। তাই ধারণা করা হয়, এগুলো সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করা হোমো হাইডেলবার্গেনসিসরা তৈরি করেছিল। তারা হয়তো লুকিয়ে থেকে হঠাৎ আক্রমণ করার জন্য এগুলো ব্যবহার করত।
অবশ্য কিছু গবেষক এই ধারণার বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, যেহেতু এই পাথরের ফলাগুলোর সঙ্গে কোনো কাঠের লাঠি খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাই এগুলোকে সরাসরি ও নিশ্চিতভাবে অস্ত্র বলা যায় না। এগুলো সাধারণ পাথরের সরঞ্জামও হতে পারে।
৫ হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর প্রথম শহরের হদিস মিলল ইরাকেদক্ষিণ আফ্রিকার কাথু প্যান নামে একটি জায়গায় প্রায় পাঁচ লাখ বছর পুরোনো কিছু পাথরের ফলা পাওয়া গেছে। এগুলোর কিনারায় ক্ষয়ের দাগ রয়েছে।
এর চেয়েও পুরোনো কিছু কি ছিল
প্রত্নতাত্ত্বিকদের খুঁজে পাওয়া তথ্যের মধ্যে এগুলোই সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্র। তবে এর চেয়েও পুরোনো অস্ত্র থাকা অসম্ভব নয়, যা হয়তো সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে।
আদিম মানুষেরা অস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস তৈরির জন্য কাঠ, পশুর রগ বা পেশি, গাছের আঁশ ও আঠার মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করত। কিন্তু মাটির নিচে হাজার হাজার বছর ধরে থাকার কারণে এসব জৈব উপাদান পচে নষ্ট হয়ে যায়।
প্রাচীন এসব অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করলে আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। অস্ত্র শুধু আঘাত করার হাতিয়ারই নয়; বরং এগুলো থেকে বোঝা যায়, আদিম মানুষেরা কীভাবে চারপাশের বিভিন্ন উপাদানকে কাজে লাগাত। এর মধ্য দিয়ে তাদের কল্পনাশক্তি, একে অপরকে শেখানো এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে এই তিনটি প্রধান আবিষ্কারের মধ্যে যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্র কোনটি? তাহলে ক্ল্যাকটন বর্শা বলাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর।








