মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় যখন দুপুরের কড়া রোদ এসে পড়বে, তখন শুধু দুটি ফুটবল দল মুখোমুখি হবে না। মুখোমুখি হবে দুটি ভিন্ন মহাদেশের অহংকার। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশ্বকাপ রাউন্ড অব ১৬-এর এই ব্রাজিল বনাম নরওয়ে লড়াই শুধু একটা ম্যাচ নয়, রীতিমতো একটা স্নায়ুযুদ্ধ।

খাতায়-কলমে শক্তির পার্থক্য দিয়ে যারা এই ম্যাচ বিচার করছেন, তারা ফুটবল নামক মহাকাব্যের আসল রোমাঞ্চটাই মিস করছেন। এই ম্যাচের ভাগ্য কোনো একক জাদুতে নির্ধারিত হবে না, বরং নির্ধারিত হবে বলের নিয়ন্ত্রণ, ট্রানজিশনের ক্ষিপ্র গতি আর মাঝমাঠের অদৃশ্য এক আধিপত্যের লড়াইয়ে।

ব্রাজিলের ক্ষতবিক্ষত মাঝমাঠ  সেলেসাওরা মাঠে নামবে তাদের চিরচেনা সাম্বা ছন্দের আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে। কিন্তু ব্রাজিলের ডাগআউটে বসা মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির কপালে চিন্তার ভাঁজ। ব্রাজিলের মাঝমাঠ এখন যেন এক রণবিক্ষত দুর্গ! মাঝমাঠের প্রাণভোমরা রাফিনিয়া এবং লুকাস পাকেতা মাঠের বাইরে। মাঝমাঠের অতন্দ্র প্রহরী কাসেমিরোর ফিটনেস নিয়ে ঝুলছে মস্ত বড় অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।

পাকেতা-রাফিনিয়ার অনুপস্থিতিতে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে বলের জোগান দেওয়া এবং সৃজনশীল পাসের জাল বোনাটাই হবে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাঝমাঠ যদি দ্রুত ভিনিসিয়ুসদের পায়ে বল পৌঁছে দিতে না পারে, তবে নরওয়ে তাদের রক্ষণভাগের ‘গ্রেট ওয়াল’ তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাবে। তাই এই ম্যাচে ব্রাজিলের জন্য আক্রমণের চেয়েও বেশি জরুরি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া।

সেলেসাওদের রক্ষণে ‘অভিজ্ঞতার ঢাল’ মাঝমাঠের এই নড়বড়ে পরিস্থিতিতে কার্লো আনচেলত্তির তুরুপের তাস হতে যাচ্ছে তার অভিজ্ঞ ব্যাকলাইন। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস, মার্কুইনহোস এবং গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী আলিসন বেকার। এই ত্রয়ী শুধু গোল আটকানোর জন্য দেয়াল তুলবেন না, তারা ধরে রাখবেন পুরো দলের মানসিক ভারসাম্য।

মাঝমাঠে নরওয়েজিয়ানরা চাপ বাড়ালে পুরো ধকলটাই সামলাতে হবে এই রক্ষণভাগকে। অর্থাৎ, ব্রাজিলের ডিফেন্স যদি ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তবেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের হাতে থাকবে। ব্রাজিলের রক্ষণই হতে যাচ্ছে এই ম্যাচের মূল ভিত্তি।

নরওয়ের ‘ঠান্ডা মাথার’ খুনে ফুটবল অন্যদিকে, উত্তর মেরুর হিমশীতল হাওয়া নিয়ে আসা স্টেল সলবাকেনের নরওয়ে কোনো ব্যক্তিনির্ভর দল নয়। তারা যেন নিখুঁতভাবে চলতে থাকা একটি জার্মান মেশিনের মতো কাঠামোনির্ভর ফুটবল খেলে। তাদের সাম্প্রতিক ফর্ম যেকোনো প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। শেষ ১০ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ৯টি জয়| শেষ ১৪ ম্যাচে  অবিশ্বাস্য ৫৬টি গোল |

সলবাকেনের রণকৌশল খুব স্পষ্ট ও নিষ্ঠুর। তারা প্রথমে মাঠের মাঝখানে একটা নিশ্ছিদ্র রক্ষণাত্মক ব্লক তৈরি করে প্রতিপক্ষের খেলার জায়গা একদম ছোট করে ফেলে। এরপর প্রতিপক্ষ ভুল করলেই চিলের মতো বল কেড়ে নিয়ে চোখের পলকে কাউন্টার অ্যাটাকে চলে যায়। আর সেই ট্রানজিশনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন ‘শিকারী’। যার নাম আর্লিং হালান্ড।

মার্টিন ওডেগার্ডের জাদু বনাম ভিনিসিয়ুসের ড্রিবলিং নরওয়ের আক্রমণের মূল চাবিকাঠি থাকবে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের পায়ে। ওডেগার্ডের কাজ হবে ব্রাজিলের প্রেসিং ভেঙে নিখুঁত সব থ্রু-বলে আর্লিং হালান্ডকে খুঁজে নেওয়া। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাত্র ৫৩ ম্যাচে ৬০ গোল করা এই নরওয়েজিয়ান ‘গোলমেশিন’ বক্সে বল পাওয়া মাত্রই তা জালে জড়াতে সিদ্ধহস্ত।

অন্যদিকে, ব্রাজিলের আক্রমণ ডানা মেলবে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পায়ে। ভিনির কাজ গোল করা নয়, বরং গতি, জাদুকরী ড্রিবলিং আর ওয়ান-অন-ওয়ান স্কিল দিয়ে নরওয়ের রক্ষণাত্মক কাঠামোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে আক্রমণের সূচনা করা।

শেষ চাল কার? মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই মহাযুদ্ধের শেষ হাসি কে হাসবে? যে দল বেশি আক্রমণ করবে তারা? একদমই নয়। জয়ী হবে সেই দল, যার রণকৌশল প্রতিপক্ষের শক্তিকে বেশি নিষ্ক্রিয় করতে পারবে।

ব্রাজিলকে তাদের মাঝমাঠের শূন্যতা ভুলে উইং দিয়ে আক্রমণের ধার বাড়াতে হবে। আর নরওয়েকে জিততে হলে ওডেগার্ড-হালান্ড জুটিকে কাজে লাগিয়ে কাউন্টার-অ্যাটাকে ব্রাজিলকে ঘায়েল করতে হবে।

এটি কেবল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াই নয়, এটি ল্যাটিন সাম্বার ছন্দের সাথে নর্ডিকদের যান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল ফুটবলের এক তীব্র ট্যাকটিক্যাল লড়াই। রেফারির বাঁশি বাজার পর মাঠের ক্যানভাসে কে কার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা!