ঠিক ৪০ বছরের ব্যবধান! মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে চার দশক পর আবারও মাঠে নামছে ইংল্যান্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো। তবে এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে ফুটবলপ্রেমীদের মনে ফিরে এসেছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। যেখানে মিশে আছে সৌন্দর্য, প্রতারণা আর সংঘর্ষের মিশ্র স্মৃতি।
৪০ বছর আগের সেই মিশ্র অধ্যায়- দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হাত দিয়ে করা গোল’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ‘বারা ব্রাভা’ ও ইংলিশ ‘হুলিগানদের’ সংঘর্ষের স্মৃতি ভর করছে এবারের রাউন্ড অব-১৬’র ম্যাচে।
মাঠের ভেতরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল সেবার। কিন্তু মাঠের বাইরে চলেছিল আরেক যুদ্ধ, যার অনেকটাই সময়ের সঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ভিডিও ও আলোকচিত্রের অভাবে আজও সেই দিনের বহু ঘটনা ইতিহাস, স্মৃতি ও লোককথার মাঝামাঝি অবস্থান করে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর উত্তেজনার পটভূমি
১৯৮৬ সালের ম্যাচটি ছিল শুধু ফুটবল নয়, তার চার বছর আগে শেষ হওয়া ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের আবেগও বহনকারী এক লড়াই। ফলে দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল চরমে।
তখন ইউরোপজুড়ে ইংলিশ হুলিগানদের নাম শুনলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। ১৯৮৫ সালের হেইসেল ট্র্যাজেডিতে লিভারপুল-জুভেন্টাস ম্যাচের আগে হুলিগানদের তাণ্ডবে ৩৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনা তখনও টাটকা স্মৃতি।

মেক্সিকো বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের সমর্থকদের খালি গা, হাতে বিয়ারের গ্লাস, মুখোশ কিংবা শরীরজুড়ে ট্যাটু দেখে অনেকেই আতঙ্কিত ছিলেন।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ছিল কুখ্যাত ‘বারা ব্রাভা’ সংস্কৃতি। তবে প্রচলিত ধারণার মতো হাজার হাজার সমর্থক নয়, বরং মাত্র কয়েক ডজন সংগঠিত সদস্যই বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বোকা জুনিয়র্সের ১৪ জন, চাকারিতা জুনিয়র্সের ৫ জন, ইউনিয়ন সান্তা ফের ২ জন, এস্তুদিয়ান্তেসের ২ জন এবং ইন্ডিপেনদিয়েন্তে, তায়েরেস ও রোজারিও সেন্ট্রালের একজন করে সদস্য।
ম্যাচের আগেই শুরু উত্তেজনা
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা ব্রিটিশ পতাকা পোড়ানো, ‘যে লাফাবে না সে ইংরেজ’ কিংবা ‘সব ইংরেজকে মেরে ফেলব’- এ ধরনের স্লোগান দিচ্ছিল। স্ট্যান্ডে উড়ছিল ‘মালভিনাস (ফকল্যান্ড) আর্জেন্টিনার’ লেখা পতাকাও।
তবে নিজেদের মধ্যেও বিভক্ত ছিল আর্জেন্টাইন বারা ব্রাভারা। বোকা জুনিয়র্স ও চাকারিতার সমর্থকদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল উত্তপ্ত। ইংল্যান্ড ম্যাচের আগেই উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বোকার নেতা হোসে বারিতা, যিনি ‘এল আবুয়েলো’ নামে পরিচিত, এস্তুদিয়ান্তেসের এক সমর্থকের সঙ্গে স্টেডিয়ামের বাথরুমে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন।
স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রথম সংঘর্ষ
২২ জুন, ১৯৮৬। ম্যাচ শুরুর আগেই আজতেকার গ্যালারিতে প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। চাকারিতা সমর্থকদের দাবি, তারা আগেভাগে গিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখেন সেটি উধাও। অভিযোগ ওঠে, ইংলিশ সমর্থকেরা পতাকাটি চুরি করেছে।
এরপর কয়েকজন আর্জেন্টাইন নিচে নেমে ইংরেজ সমর্থকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। পাল্টা কয়েকটি ইংলিশ পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে আবার নিজেদের জায়গায় ফিরে আসে। কিছুক্ষণ পর এস্তুদিয়ান্তেসের এক সমর্থক হারানো আর্জেন্টাইন পতাকাটিও উদ্ধার করেন।
তাদের ভাষায়, পুরো ম্যাচজুড়েই এমন ছোট-বড় সংঘর্ষ চলতে থাকে।
সবচেয়ে আলোচিত মারামারি
সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল রাউল গামেজের মারামারি। একসময় ভেলেজ সার্সফিল্ডের সমর্থকগোষ্ঠীর নেতা থাকা গামেজ দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ইংরেজ সমর্থকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।
পরে তিনি দাবি করেন, এক বিখ্যাত আর্জেন্টাইন হেয়ারস্টাইলিস্ট একজন ইংরেজের কাছ থেকে পতাকা ছিনিয়ে নিতে গেলে হুলিগানরা আক্রমণ করে। তিনি বাধা দিতে গিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই হেয়ারস্টাইলিস্ট ছিলেন রবার্তো জিওর্দানো।
বোকা সমর্থক ক্লদিও ভারেলার ভাষ্য অনুযায়ী, জিওর্দানো নিজেই একজন আলোকচিত্রীকে ছবি তোলার জন্য ডেকে ইংরেজের পতাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এরপরই সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রথমদিকে মাতাল ইংরেজ সমর্থকদের ঠেকানো গেলেও পরে সংখ্যাধিক্যের কারণে গামেজকে বোতল হাতে আত্মরক্ষা করতে হয়েছিল। এই সংঘর্ষের বেশ কয়েকটি ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই স্টেডিয়ামের বাইরে
তবে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়েছিল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর, আজতেকা স্টেডিয়াম থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। এই লড়াইয়ের কোনো ছবি বা ভিডিও নেই, ফলে সেটিই সবচেয়ে বেশি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।
বোকা জুনিয়র্সের নেতা ‘এল আবুয়েলো’র নেতৃত্বে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের সঙ্গে ইংরেজদের তুমুল সংঘর্ষ হয়।
বোকা সমর্থক ক্লদিও ভারেলা দাবি করেন, শুরুতে ইংরেজরা কেবল ঘুষি দিয়ে লড়তে চাইলেও আর্জেন্টাইনরা বোতল ছুড়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। পরে ইংরেজরা রাস্তার পাথর ছুড়তে শুরু করলে এল আবুয়েলো হাঁটুতে আঘাত পান। তবে শেষ পর্যন্ত তারা চেলসি ও ওয়েস্ট হ্যামের দুটি পতাকা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন।

অন্যদিকে ইউনিয়ন সান্তা ফের সমর্থক লুইস ‘লুচি’ ফ্লোরেসের দাবি, আহত এল আবুয়েলোকে তিনি কাঁধে তুলে প্রায় ১০০ মিটার দৌড়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। পরে সেই ঘটনার জন্য এল আবুয়েলো তাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। সেখান থেকেই দুজনের দীর্ঘ বন্ধুত্বের সূচনা হয়।
লুইস ‘লুচি’ ফ্লোরেসও সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘মারামারির শুরুটা হয়েছিল স্টেডিয়ামের বাইরে। আমরা প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত ইংরেজদের ধাওয়া করি। একসময় প্রায় ১৫ জন ইংরেজ একটি দেয়ালের সামনে, সেতুর ওপর গাদাগাদি করে আটকা পড়ে। এরপর তারা আবার সংগঠিত হয়। আগের বছরের ভূমিকম্পে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ থেকে তারা ইট-পাথর তুলে আমাদের দিকে ছুড়তে শুরু করে। একটি পাথর গিয়ে লাগে ‘এল আবুয়েলো’-র গায়ে। সেটি তার হাঁটুতে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তখন এক ইংরেজ সেই পাথরটি তুলে আবুয়েলোর মাথায় ছুড়ে মারতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে আঘাত করি এবং অজ্ঞান করে দিই। এরপর আবুয়েলোকে কাঁধে তুলে নিই। বোকা জুনিয়র্সের সমর্থকদের বলি আমার পেছনটা সামলাতে। তারপর প্রায় ১০০ মিটার দৌড়ে একটি ভ্যানে পৌঁছে আমরা সেখান থেকে চলে যাই।’
ফ্লোরেস আরও বলেন, “পরে আবুয়েলো আমাকে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সেদিন রাতে আমি সেখানে গেলে বোকা জুনিয়র্সের এক সমর্থক প্রথমে আমাকে আটকে দেয়। কিন্তু অন্যরা তাকে বলে, ‘এ-ই সেই ছেলে, যে আবুয়েলোর জীবন বাঁচিয়েছিল।’ এরপর আমি ভেতরে যাই। দেখি, আবুয়েলোর উরু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত প্লাস্টার করা। সেদিন থেকেই আমাদের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল।
ইতিহাস না কিংবদন্তি?
১৯৮৬ সালের সেই সংঘর্ষ নিয়ে আজও নানা গল্প প্রচলিত। অনেক ভিডিওকে ওই ঘটনার কথা বলে দাবি করা হলেও পরে প্রমাণ হয়েছে, সেগুলো অন্য সময়ের ফুটেজ।
তাই চার দশক পরও সেই দিনের প্রকৃত ঘটনা পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- ম্যারাডোনার দুই ঐতিহাসিক গোলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচটি আজতেকার গ্যালারিতেও ছিল এক উত্তপ্ত সংঘর্ষের মঞ্চ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সমর্থক-অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
এবার, ৪০ বছর পর, ইংল্যান্ড আবার ফিরছে সেই আজতেকায়। এই ম্যাচের আগেও মেক্সিকো সিটি উত্তাল। ইংল্যান্ড ফুটবলারদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তার আয়োজন করা হয়েছে। হ্যারি কেইনদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়ে মাঠে নিষ্ক্রীয় করে দেয়ার পরিকল্পনা মেস্কিকান উগ্র সমর্থকদের। যদিও এবার ইংরেজ হুলিগানদের কথা খুব একটা শোনা যাচ্ছে না।
মাঠের বাইরের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তাই ৪০ বছর আগের সেই সংঘর্ষময় স্মৃতির কথাই বার বার টেনে আনছে। যদিও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কারণে আশা করা যায়, এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে শুধুই ফুটবল, গ্যালারির সহিংসতা নয়।
আইএইচএস/








