নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের গোড়াপত্তন ও আধুনিকায়নের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের রেলপথ। সেই গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী দেড় শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহাসিক টেলিগ্রাফ অফিস ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন। তবে তদারকি ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে বিটিসিএলের মালিকানাধীন এই প্রাচীন যোগাযোগ স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের মুখে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় এর ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
সরেজমিন দেখা যায়, ভবনটি এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এর দেওয়ালে নানা লতাপাতার গাছ গজিয়েছে, দরজা-জানালা খুলে পড়েছে এবং খসে পড়েছে পলেস্তারা। মূল ভবনের পাশের কোয়ার্টারগুলোতে লোকজন অবৈধভাবে বসবাস করছেন। সামনে ও পেছনে আবর্জনার স্তূপ।
আরও পড়ুন
সিলেটের শতবর্ষী বেতশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বৃহত্তর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের শিয়ালদহ-শিলিগুড়ি ব্রডগেজ লাইনের প্রধান জংশন ছিল সৈয়দপুর। এই ব্রডগেজ লাইনের ট্রেন চলাচল ও সিগন্যালের বার্তা দ্রুত আদান-প্রদানের জন্য জন্য স্টেশনের পাশেই প্রায় এক একর জমির ওপর এই অফিসটি স্থাপন করা হয়। চুন-সুরকি, পোড়ামাটির লাল ইট এবং ভারী লোহার বিম দিয়ে এটি নির্মাণ করে ব্রিটিশ গণপূর্ত বিভাগ। খিলান আকৃতির দরজা-জানালা আজও ভবনটির প্রাচীন ঐতিহ্যের জানান দেয়। এর ভেতরে কাজের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি সুপরিসর কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ভবনের মাঝখানের বিশাল হলরুমটি ছিল টেলিগ্রাফের মোর্স কোড রিসিভার। এছাড়া রয়েছে স্টাফ কোয়ার্টার ও প্রাচীন টেলিকম টাওয়ার।
‘চুন-সুরকি, পোড়ামাটির লাল ইট এবং ভারী লোহার বিম দিয়ে এটি নির্মাণ করে ব্রিটিশ গণপূর্ত বিভাগ। খিলান আকৃতির দরজা-জানালা আজও ভবনটির প্রাচীন ঐতিহ্যের জানান দেয়। এর ভেতরে কাজের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি সুপরিসর কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ভবনের মাঝখানের বিশাল হলরুমটি ছিল টেলিগ্রাফের মোর্স কোড রিসিভার’
সূত্রের তথ্যমতে, ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অফিসটি ছিল একমাত্র ভরসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আসাম সীমান্তে জাপানি সেনাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের রসদ সরবরাহের জরুরি ‘তারের খবর’ পাঠাতে এই অফিসটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হতো। স্বাধীনতার পর এটি পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন বিভাগ, টিঅ্যান্ডটি বোর্ড, বিটিটিবি এবং সবশেষ ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) অধীনে আসে।
আরও পড়ুন
অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহী সিল্ক, ভরসা এখন বিদেশি সুতা
নব্বইয়ের দশকে এখানে আধুনিক ডিজিটাল সুইচিং ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই শহরের নিয়ামতপুর এলাকায় বিটিসিএলের নতুন অফিস স্থানান্তরিত হলে ঐতিহাসিক এই ভবনটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন কোনো তদারকি না থাকায় মূল্যবান এই ভূ-সম্পত্তিটি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবনটিকে সরকারি উদ্যোগে দ্রুত সংস্কার করে টেলিযোগাযোগ প্রদর্শনী কেন্দ্র বা তথ্যচিত্র জাদুঘরে রূপান্তর করা হলে এটি রক্ষা পাবে। এতে যোগাযোগের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে নতুন প্রজন্ম।
‘নব্বইয়ের দশকে এখানে আধুনিক ডিজিটাল সুইচিং ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই শহরের নিয়ামতপুর এলাকায় বিটিসিএলের নতুন অফিস স্থানান্তরিত হলে ঐতিহাসিক এই ভবনটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে’
সৈয়দপুর শিল্প সাহিত্য ও নাট্যগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক সরফরাজ আহম্মেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঐতিহাসিক পুরোনো এই ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন প্রজন্ম গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে না। কারণ এটি কেবল একটি সাধারণ ভবন নয়; এটি এ অঞ্চলের যোগাযোগের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাই যে কোনো মূল্যে এটি রক্ষা করতে হবে।’
আরও পড়ুন
শ্বশুরবাড়িতে দেশি মোরগে জামাই আপ্যায়ন এখন কেবলই গল্প
ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন আব্দুর রশিদ টিপু। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজকের আধুনিক সৈয়দপুরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। এর আগে সৈয়দপুর ছিল সাধারণ গ্রাম। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই এদেশে গড়ে তুলতে থাকে রেলপথ। এরই এক পর্যায়ে সৈয়দপুর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ স্থান।’
আরও পড়ুন
সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন / ছোটদের নামতে হয় লাফ দিয়ে, বয়স্কদের কোলে করে
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫০ বছর অথবা তারও আগেকার কথা। সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন গড়ে ওঠার পর এই অঞ্চলে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়। বিস্তৃৃৃতি ঘটতে থাকে শহরের। তারপরই ১৮৭০ সালে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে বিবেচিত। সেসময় ইংরেজরা এ শহরে টেলিগ্রাফ অফিস ও চিত্তবিনোদনের জন্য এখানে একটা সুরম্য মিলনায়তন গড়ে তোলে।’
‘ঐতিহাসিক পুরোনো এই ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন প্রজন্ম গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে না। কারণ এটি কেবল একটি সাধারণ ভবন নয়; এটি এ অঞ্চলের যোগাযোগের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাই যে কোনো মূল্যে এটি রক্ষা করতে হবে’
কথা হয় সৈয়দপুর রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘উত্তরের বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে এ শহরের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। শহরের ভৌগলিক দিক বিবেচনা করে বিৃটিশরা এশিয়ার বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেদের সুবিধার্থে টেলিগ্রাফ অফিসসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেন তারা। এসব স্থাপনার মধ্যে বেশিরভাগই কার্যত সচল থাকলেও টেলিগ্রাফ অফিস পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ইতিবাচক পদেক্ষে নিলে ভালো হয়।’

বিটিসিএলের নীলফামারী কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক (টেলিকম) রেজওয়ানুল হক জানান, বিটিসিএলের কার্যক্রম বর্তমানে নতুন কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তবে পুরোনো কার্যালয়ে বিটিসিএল ও টেলিটকের টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ার দেখভালের জন্য সেখানকার স্টাফ কোয়ার্টারে কর্মী আছেন।
আরও পড়ুন
ঐতিহ্যের সাক্ষী গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংকের গেস্ট হাউজ
তিনি আরও বলেন, মূল ভবনটি অনেক পুরোনো হওয়ায় এখন আর ব্যবহার করা হয় না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত। সামনে হয়তো এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এসআর/এএসএম








