বর্তমান সরকারকে বিগত ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের অনেক দায় টানতে হচ্ছে, যা রাজনীতি, প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা ও অর্থনীতিতে লুকিয়ে আছে। তাই সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কাজ করতে হচ্ছে। এসব সমস্যার অনেক দৃশ্যমান হলেও, অনেক আবার প্রতিষ্ঠান, নীতি, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। ফলে শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমেই এগুলো দূর করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, লুটপাট ও কুশাসন দূর করার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত শাসনের নেতিবাচক প্রভাবে ব্যাংক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঋণ কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, কিছু ব্যাংকে তারল্য সংকট, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতার অভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।
বিশ্বের সব দেশেই ব্যাংক খাতকে বলা হয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ মেরুদণ্ডই যখন ভেঙে যায়, তখন শারীরিক অসুস্থতার মতো পুরো অর্থনীতি টলমল করে। বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল শেষে যখন নানা তদন্ত, মামলা ও নথি প্রকাশ পায়, তখন দেখা যায়-ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট ছিল প্রায় এক সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। কীভাবে এ দুর্নীতি বিস্তৃত আকার পেয়েছিল, তার প্রতিবিধান করা এবং ভবিষ্যতের জন্য এমন লুটপাট বন্ধ করা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।
ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বোঝার জন্য প্রথম যে তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো প্রিন্সিপল-এজেন্ট থিওরি। এখানে আমানতকারী ও জনগণ মূলত প্রিন্সিপল, আর ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এজেন্ট। এ সিস্টেমে আদর্শ অবস্থায় এজেন্টের কাজ প্রিন্সিপলের স্বার্থ রক্ষা করা-নিরাপদ ঋণ বিতরণ, ঝুঁকি কমানো, স্বচ্ছ হিসাব রাখা। কিন্তু যখন এজেন্ট নিজের বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়-নিয়ম ভেঙে ঋণ দেয়, জাল কাগজে ঋণের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখায় বা হিসাব গোপন করে, তখনই দুর্নীতি শুরু হয়। বিগত ১৫-১৬ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক গভর্নর, কিছু ব্যাংকের পরিচালক ও এমডির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে-শিথিল নীতিমালা জারি করে খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া, বিতর্কিত ঋণ অনুমোদন, রিজার্ভ চুরি বা বড় ঋণ কেলেঙ্কারিতে নীরবতা-এসব ঘটনাকে প্রিন্সিপল-এজেন্ট তত্ত্বের আলোয় সহজে ব্যাখ্যা করা যায়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো প্রিন্সিপল-এজেন্ট তত্ত্ব। এ তত্ত্ব বলে, যখন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং শাস্তি প্রয়োগের কাঠামোকে নিজের সুবিধামতো বেঁকিয়ে নেয়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আর জনস্বার্থে কাজ করতে পারে না। অতীতে ব্যাংক খাতের বাস্তবতা এ তত্ত্বের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০০৯-২০২৪ সালের মধ্যে ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার নিজেই দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের অনুরোধ করে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধানদের বিরুদ্ধে নথি তলবের ঘটনা দেখায়-নীতিনির্ধারণ ও তদারকির শীর্ষস্থানেও প্রশ্ন উঠেছে। স্টেট-ক্যাপচারের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ঘটনা বলতে চায় : ব্যাংকগুলো একসময় অনেকটা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর ‘অর্থ-আহরণের যন্ত্রে’ পরিণত হয়েছিল, যেখানে নীতিমালা, তদারকি এবং শাস্তি সবই ব্যবহার হয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসাবে।
তৃতীয়ত, মোরাল হ্যাজার্ড তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো পক্ষ জানে যে ঝুঁকির খরচ তার ঘাড়ে সম্পূর্ণ পড়বে না, তখন সে বেশি ঝুঁকি নেয়। ব্যাংকিং দুর্নীতিতে এ মানসিকতা স্পষ্ট-বড় ঋণগ্রহীতা, প্রভাবশালী গোষ্ঠী, এমনকি কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা জানতেন, অনিয়ম ধরা পড়লেও রাজনৈতিক ছায়া এবং দুর্বল আইনপ্রয়োগের কারণে তারা অনেকটা রক্ষা পেয়ে যাবেন। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের সাড়ে ১০ মাসে ২৭ হাজারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর) পাওয়া গেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। বিদেশে অর্থ পাচার, ভুয়া হিসাব খুলে সঞ্চয়পত্রের টাকা আত্মসাৎ, জামানত ছাড়াই জাল ঋণ-এসব ঘটনায় জড়িতরা বারবার সিস্টেমের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে মোরাল হ্যাজার্ড তত্ত্ব স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় : যখন আইনের কঠোরতা নেই, যখন শাস্তি অল্প বা অনিশ্চিত, তখন দুর্নীতির ঝুঁকি নেওয়া ‘ব্যবসায়িক ক্যালকুলেশনে’ পরিণত হয়।
চতুর্থত, করপোরেট গভর্ন্যান্স তত্ত্ব বলে, একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ, স্বাধীন অডিট, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্পষ্ট জবাবদিহিতা প্রয়োজন। পতিত সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা দেখা গেছে, তা এর ঠিক উলটো। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে সাবেক তিন গভর্নরের সময়ে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি, রিজার্ভ চুরির ঘটনার যথাযথ অনুসন্ধান না হওয়া, হলমার্ক জালিয়াতিসহ বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসায়িক গ্রুপের জামানত ছাড়া শত কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির দুদক মামলা এ সুশাসনের ব্যর্থতার প্রতীকী উদাহরণ।
ঋণ কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের মাধ্যমে আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়ায় বোঝা যায়-দুর্নীতি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক, সঞ্চয়পত্রের টাকা আত্মসাৎ করতে ভুয়া ব্যাংক হিসাব তৈরি ও একাধিক সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক শাখা ব্যবহার বা জাল কাগজে জামানত দেখিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ-এসব ঘটনা একক ব্যক্তির উদ্যোগে নয়; বরং বহু স্তরের নীতি নির্ধারক, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর যোগসাজশে সম্ভব হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ডিভিশন দুদকের কাছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষকর্তা এবং ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক, এমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। অভিযোগ-এই দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে।
দুদকের উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সাবেক গভর্নরের-আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের বিরুদ্ধে ২৩ ধরনের নথি তলব করা হয়, যেখানে অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ আছে নীতিমালা শিথিল করে ঋণ খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া, রিজার্ভ চুরি, বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ও বিশেষ ব্যবসায়িক গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ইত্যাদি। এমন নথি তলব নিছক প্রশাসনিক ব্যাপার নয়। এটি রাজনৈতিক অর্থে একটি যুগের ব্যাংকিং নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিফলন। দীর্ঘসময় ধরে ‘বৃদ্ধি’ ও ‘উন্নয়ন’-এর আড়ালে ব্যাংক খাতে যে নৈরাজ্য চলেছে, তা আইনি তদন্তের টেবিলে আনা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক সুশাসনের জন্য আবশ্যক।
প্রথম কাজ হলো ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক চাপ, প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া। তা না দিলে, তদন্ত ও শাস্তির ক্ষেত্র যতই প্রসারিত হোক, বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। দ্বিতীয়ত, বড় ঋণ অনুমোদন, পুনঃতফসিল, এবং জামানত যাচাই-এ তিনটি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। related-party lending নিয়ন্ত্রণ করা, বোর্ডে স্বার্থসংঘাত এড়ানো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে পেশাদারভাবে শক্ত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। দুদকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজকে সময়মতো নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাও অপরিহার্য। বহু বছর ধরে চলা কেলেঙ্কারির মামলা যদি ঝুলে থাকে, তবে তা দুর্নীতিবাজদের কাছে উৎসাহের বার্তাই দেয় এবং নতুন দুর্নীতির রাস্তা প্রশস্ত করে।
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের ব্যাংকিং দুর্নীতির চিত্র আমাদের সামনে যে কঠিন সত্য হাজির করেছে, তা হলো-আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে দীর্ঘসময় ধরে রাজনৈতিক স্বার্থ, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কাছে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। তত্ত্বের আলোয় এ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। কারণ তত্ত্বই আমাদের শেখায় কোথায় কাঠামোগত ভুল, কোথায় নীতি পরিবর্তন দরকার আর কোথায় সংস্কৃতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য। যদি আমরা ব্যাংক খাতকে নতুন করে দাঁড় করাতে চাই, তবে শুধু কেলেঙ্কারি গণনা করলেই হবে না। বরং দুর্নীতিকে সম্ভব ও সহজ করে তোলা প্রতিটি স্তরের প্রণোদনাকে ভেঙে নতুন প্রণোদনা তৈরি করতে হবে-যেখানে সততা লাভজনক আর অনিয়ম ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ সাহসী পুনর্গঠনের ওপর। আমরা যদি এই পুনর্গঠন করতে পারি, তাহলেই হয়তো একদিন বলতে পারব-ব্যাংক আবার সত্যিই জনগণের অর্থের অভিভাবক হিসাবে ফিরে এসেছে, লুটপাটের আখড়া হিসাবে নয়।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)








