ভর্তুকি, পে-স্কেলসহ চার ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। সোমবার অর্থ বিভাগ, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল। এছাড়া আইএমএফ প্রতিনিধিদলটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করে। ওই বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং আইএমএফও এ বিষয়ে একমত হয়েছে। কোন সংস্কার কখন করা প্রয়োজন, সেই অগ্রাধিকার ঠিক করেই এগোনো হবে।
বৈঠক সূত্র জানা যায়, ভর্তুকি কমাতে না পারা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার-এই চার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, কিছু কিছু খাতে ভর্তুকি শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও উলটো বাড়িয়েছে নতুন বাজেটে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ভর্তুকি শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে আগের সরকারের মতোই এ সরকারও ঢিলেঢালা ভাব দেখাচ্ছে। যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও কাঠামোগত সংস্কারে ধীরগতি ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখনো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থান, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সুশাসন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসাবে রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইস্যু হলো-নতুন পে-স্কেল। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আলোচনা চললেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি কার্যকর করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম এবং বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এ অবস্থায় বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। আইএমএফ-এর মতে, মূল্যস্ফীতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল চালু হলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হবে, যা ভোগব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
তৃতীয় উদ্বেগের জায়গা রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহ-এই দুটি পৃথক কাঠামোয় পুনর্গঠনের সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু বাস্তবায়ন অগ্রগতি ধীর হওয়ায় সংস্থাটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো না গেলে সরকারের আয় বৃদ্ধি কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলমান আলোচনা শেষে আইএমএফ বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন দেবে। সেই মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচি, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্ব আদায়ের কৌশল জানাল এনবিআর : এদিকে বিকালে আইএমএফ প্রতিনিধিদল আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে এনবিআর-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এনবিআর-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্বে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস নীতি বিভাগের সদস্য; প্রথম সচিব ও দ্বিতীয় সচিবরা এ বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব নীতি ও সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা আইএমএফ প্রতিনিধিদলকে জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে করহার না বাড়িয়ে সরকার করজাল সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে। এতে দেশের জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে করজাল। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় আগের তুলনায় বাড়বে। এছাড়া বাজেটে প্রয়োজনীয় করছাড় ব্যতীত নতুন করে কোনো করছাড় দেয়নি সরকার।
দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে সরকার ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে।
কী শর্তে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা : দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত মোট কত টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে, সেই হিসাব জানতে চেয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি এসব সহায়তা কী শর্তে দেওয়া হয়েছে, সহায়তা পাওয়া ব্যাংকগুলো সেই শর্ত কতটা পরিপালন করেছে, অর্থ ফেরতের অবস্থা কী এবং ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণ ও তা মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল সোমবার দ্বিতীয় দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি পলিসি অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন ডিপার্টমেন্টের (এসপিসিডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
উল্লেখ্য, আইএমএফ-এর বর্তমান মিশন সরকারের প্রস্তাবিত ৪৫০-৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। ১৬ জুলাই পর্যন্ত চলা এই সফরে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হবে। অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের চার মাসের কর্মকাণ্ডে আর্থিক খাতের সংস্কার, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং রাজস্ব আদায়ে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।








