জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘদিন বিরোধীদলে থাকার পর বিএনপি সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। আন্দোলন-সংগ্রামভিত্তিক সংগঠন থেকে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠন হিসেবে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে দলটি। ফলে নতুন নেতৃত্ব কেমন হবে, তা নিয়ে চলছে নানা ধরনের আলোচনা।
দলীয় সূত্র বলছে, এবার শুধু আন্দোলনে ভূমিকার ভিত্তিতে নয়, বরং নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া, সাংগঠনিক দক্ষতা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ এবং নারী নেতৃত্বের অংশ নেওয়ার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্বের ধারা থেকে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়ের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ছাত্রদলের কাজ ওসিকে ফুল দেওয়া নয়: সরোয়ার আলমগীর
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বিরোধী দলে থাকার সময় ছাত্রদলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন না। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল বলে সংগঠনের ভেতরেও আলোচনা ছিল।
ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, সরকারে আসার পর সংগঠনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করা। সে কারণে আগের তুলনায় ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন।
যে বিষয়গুলো পাচ্ছে গুরুত্ব
দলীয় সূত্র জানায়, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার, জুলাই অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের মূল্যায়ন, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা।
আরও পড়ুন
রাজধানীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বিক্ষোভ
এ ছাড়া নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্যান্য পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা পর্যায়ের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন, পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংগঠনের একাধিক সূত্র জানায়, অতীতে কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য ছিল। এবার 'সুপার ফাইভ' কিংবা 'সুপার সেভেন'-এ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা ইউনিটের নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ জাগো নিউজকে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং যাদের ছাত্রত্ব আছে, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মাঝে জনপ্রিয়তা আছে, তাদের নিয়েই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা উচিত। তিনি বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে লিঙ্গ নয়, যোগ্যতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্যবিষয়। ছেলে বা মেয়ে— যেই অধিক যোগ্য ও সক্ষম হবে, তারই কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া উচিত।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা, ছাত্রত্ব থাকা এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নেতাদের নিয়েই ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা উচিত। নেতৃত্ব নির্বাচনে লিঙ্গ নয়, যোগ্যতা ও সক্ষমতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।—ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিম বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও ত্যাগী নেতাদেরই নতুন কমিটিতে মূল্যায়ন করা উচিত। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় বা অনলাইনে 'ভোকাল' হওয়া নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা হতে পারে না। তিনি বলেন, একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সিন্ডিকেটনির্ভর কমিটি গঠনের সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি।
আরও পড়ুন
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধরিয়ে দিলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা
ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাফি ইসলাম বলেন, যারা বিগত আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করেন, তাদেরই নেতৃত্বে আনা উচিত। একই সঙ্গে তিনি ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত কমিটি দেওয়ার সংস্কৃতি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা বলেন, আমি আশা করছি, এবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন চমক দেখাবেন। তারমতে, নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।
ছাত্রদলের এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিএনপি চেয়ারম্যান নতুন চমক দেখাবেন। নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। — বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা
তিনি বলেন, নারী বা পুরুষ— যেই হোক না কেন, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাবে। কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য না দিয়ে নেতৃত্বের যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং গ্রহণযোগ্যতাকেই নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশী এক নারী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য রয়েছে। এই ধারা পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়েও অনেক যোগ্য নেতৃত্ব রয়েছে।’
আরও পড়ুন
নতুন কমিটি ঘিরে রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের দুই পক্ষের কোন্দল
তিনি বলেন, ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের যে মডেল দেখা গেছে, সেখান থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়েও যোগ্য নেতৃত্ব থাকলে তাকেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে সুযোগ দেওয়া উচিত।
ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ছাত্রদলের আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ে সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই সিদ্ধান্ত নেবেন।
ছাত্রদলের আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ে সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই সিদ্ধান্ত নেবেন।— ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাকিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের এবং নাছির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
আরও পড়ুন
ফেসবুক লাইভে কান্নার পর ছাত্রদলে পদ পেলেন সেই নয়ন
নতুন কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, অতীতের বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার এমন একটি নেতৃত্ব আসবে, যারা একদিকে নিয়মিত শিক্ষার্থী ও আন্দোলনে পরীক্ষিত, অন্যদিকে দেশের সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ পায়, তা এখন নির্ভর করছে তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
কেএইচ/এমএএইচ/








