তাফুরা খাতুন, আয়ারল্যান্ড
যারা আয়ারল্যান্ডে প্রবাসী কিংবা নাগরিক জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের কাছে ডাবলিন শহরের চেনা কোলাহল, ট্রামের শব্দ আর ব্যস্ততা খুবই পরিচিত। কিন্তু এই যান্ত্রিকতার বাইরেও যে আয়ারল্যান্ডে এমন এক শান্ত, স্নিগ্ধ আর অকৃত্রিম রূপ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কাউন্টি মেয়ো-তে না গেলে বিশ্বাস করা কঠিন।
আটলান্টিক মহাসাগরের একদম কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই অঞ্চলটিকে আমার কাছে আয়ারল্যান্ডের বুকে এক টুকরো স্বর্গ বলেই মনে হয়েছে।
ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছে একটু শান্তির খোঁজে যারা সপরিবারে ঘুরে বেড়াতে চান, তাদের জন্য মেয়ো কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং মনের খোরাক জোগানোর মতো একটি দারুণ আশ্রয়।
আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই কাউন্টি মেয়ো। আটলান্টিকের ঢেউ যেখানে এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে ক্লিফে, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় এর অপরূপ সৌন্দর্য। চারদিকে সবুজ পাহাড়, শান্ত হ্রদ, নদী আর সুবিশাল সমুদ্র সৈকতের এমন মেলবন্ধন আয়ারল্যান্ডের খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।
এখানকার বিখ্যাত ‘ক্রো প্যাট্রিক’ পাহাড়ের কথাই ধরা যাক। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কেবল এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে বা ধর্মীয় ঐতিহ্যের টানে এই পাহাড়ে ছুটে আসেন। আবার অন্যদিকে রয়েছে ‘অ্যাকিল দ্বীপ’। এই দ্বীপের পাহাড়ি রাস্তা, নির্জন সমুদ্র সৈকত আর চারপাশের নির্মল বাতাস বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো এক দারুণ অনুভূতি দেয়।
যারা আয়ারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত ‘বন্য আটলান্টিক পথ’ ধরে গাড়ি চালিয়েছেন, তারা জানেন মেয়োর অংশটুকু কতটা রোমাঞ্চকর। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, খাড়া পাহাড়ের চূড়া আর দিগন্ত ছোঁয়া সূর্যাস্তের দৃশ্য যে কোনো মানুষকে প্রকৃতির প্রেমে পড়তে বাধ্য করবে।
তবে মেয়োর আসল সৌন্দর্য শুধু এর প্রকৃতিতে নয়, এখানকার সংস্কৃতি এবং মানুষের মধ্যে। এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষি, পশুপালন আর মৎস্যশিল্পের ওপর টিকে আছে। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পও স্থানীয় মানুষের বড় ভরসা। কিন্তু এত পর্যটকের আনাগোনার পরেও এখানকার মানুষ তাদের ঐতিহ্য হারায়নি। প্রাচীন দুর্গ, শত বছরের পুরোনো গির্জা আর মঠগুলো দেখলে মনে হয়, যেন আয়ারল্যান্ডের জীবন্ত ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে ওখানকার মানুষের আতিথেয়তা। স্থানীয় আইরিশ ভাষা, তাদের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত এবং নাচ মেয়োর মানুষের জীবনকে এক অদ্ভুত মাধুর্য দিয়েছে। আর খেলাধুলার প্রতি তাদের যে আবেগ, বিশেষ করে তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘গেইলিক ফুটবল’ নিয়ে স্থানীয়দের মাতামাতি সত্যিই দেখার মতো।
কেন মেয়ো আপনার পরবর্তী ভ্রমণের তালিকায় থাকা উচিত?
প্রকৃতির আদিম রূপ: চোখ জোড়ানো সবুজ পাহাড় আর নীল সমুদ্রের এক অপূর্ব ক্যানভাস।
নিখাদ নীরবতা: শহরের কৃত্রিম কোলাহল থেকে দূরে এক টুকরো শান্ত পৃথিবী।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া: প্রাচীন আইরিশ সভ্যতার আসল রূপ কাছ থেকে দেখার সুযোগ।
উষ্ণ আতিথেয়তা: স্থানীয় মানুষের অমায়িক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, যা মনে দাগ কেটে যায়।
আমরা যখন আয়ারল্যান্ডে ভ্রমণের পরিকল্পনা করি, তখন অনেক সময় চেনা কিছু জায়গার বাইরে চোখ ফেরাতে পারি না। কিন্তু আপনি যদি প্রকৃতির আসল শান্তি, ইতিহাসের গভীরতা আর আইরিশ সংস্কৃতির খাঁটি স্বাদ একসঙ্গে পেতে চান, তবে কাউন্টি মেয়ো হতে পারে আপনার জন্য আদর্শ গন্তব্য। যান্ত্রিক জীবনকে ছুটি দিয়ে একবার আটলান্টিকের এই কোলে হারিয়ে গিয়ে দেখুন, মন সতেজ হতে বাধ্য।
এমআরএম








