বরিশালের মেঘনা উপকূলীয় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের অসংখ্য জেলের জীবন দাদনের চক্রে বন্দি। জ্বালানি সংকট, ঘন ঘন সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ার সুযোগে আড়তদার ও মহাজনদের চড়া সুদের ফাঁদে আটকে পড়েছেন হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জের মৎস্যজীবীরা। জীবন বাজি রেখে প্রতিদিন নদী ও সমুদ্রে জাল ফেললেও ঋণের বোঝা না কমে বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে দাদন নেওয়া এসব প্রান্তিক জেলের সংসার এখন অনিশ্চয়তা আর চরম ক্ষোভের মুখে।
জানা গেছে, বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ধুলখোলা, মেমানিয়া, হরিনাথপুর, বড়জালিয়া, উলানিয়া, গোবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এক থেকে দেড় লাখ জেলের বসবাস। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা। কিন্তু মাছ ধরার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
বরিশালের খোরশেদ আলম ১৫ বছর ধরে সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরছেন। প্রতিদিন মাছ ধরে মহাজনের লোকের কাছে বিক্রি করলেও বছর শেষে লাভের বদলে বাড়ছে ঋণের বোঝা। প্রতি মৌসুমে নতুন করে দাদন নিতে হয়। সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলছে তার সুদ। এমন দারিদ্র্যের মধ্যেও ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
‘জেলেদের জন্য সরকারের খাদ্যসহায়তা ও বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলে অনেক পরিবারের জন্য এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে পড়ে। ফলে অনেক জেলে সংসারের খরচ, নৌকা মেরামত, জাল কেনা ও মাছ ধরার প্রস্তুতির জন্য মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হন।’
এ বছর জ্বালানি তেলের সংকটে প্রায় দুই মাস মাছ ধরতে যেতে পারেননি জেলেরা। এরপর ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় দীর্ঘ সময় তাদের আয় বন্ধ ছিল। নিবন্ধিত জেলেরা কিছু চাল ও প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে কোনো সহায়তা পাননি। ফলে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন
দক্ষিণে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি, সংকটে ৪১ হাজার কৃষক
হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া এলাকার জেলে ইয়াকুব ব্যাপারী জাগো নিউজকে বলেন, এবার তেলের সংকটের কারণে প্রায় দুই মাস ঘরে বসে ছিলাম। এরপর নিষেধাজ্ঞার সময়ও মাছ ধরতে পারিনি। সংসার চালাতে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে। দাদন নিতে নিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাছ ধরে বিক্রি করেও এই ঋণ শোধ করা যায় না।
হিজলা উপজেলার মাছ ব্যবসায়ী ও দাদনদাতা মো. আব্দুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, জেলেদের প্রয়োজনে আমরা টাকা দিই। অনেক সময় তারা কয়েক মাস বা এক মৌসুম পর টাকা ফেরত দেন। এতে আমাদেরও ঝুঁকি থাকে। তাই নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রির শর্ত রাখা হয়। তবে সুদের হার নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে, সেটি সবাই একভাবে নেন না।
আরেক আড়তদার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ না পাওয়ায় জেলেরা আমাদের কাছে আসেন। আমরা টাকা না দিলে অনেকেই মৌসুমে মাছ ধরতেই নামতে পারবেন না। তবে সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমাদের কাছ থেকে দাদন নেওয়ার প্রয়োজনও অনেক কমে যাবে।

জেলেদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যান। মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়। তবে সেই ঋণের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট আড়তেই মাছ বিক্রি করতে হয়। বাজারে বেশি দাম পেলেও অন্য কোথাও মাছ বিক্রির সুযোগ থাকে না।
‘মাছ কম পেলেও ঋণের কিস্তি ঠিকই দিতে হয়। বাজারে ভালো দাম থাকলেও আমরা অন্য কোথাও মাছ বিক্রি করতে পারি না। দাদন নেওয়ার শর্তেই নির্দিষ্ট আড়তে মাছ দিতে হয়।’
তাদের দাবি, এক মৌসুমের জন্য লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। বছরের পর বছর সুদ পরিশোধ করলেও আসল ঋণ থেকে যায়। অনেকের বিরুদ্ধে আগাম সই করা চেকের ভিত্তিতে মামলাও হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৪২১ জন। তবে অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা নিবন্ধিতের প্রায় দ্বিগুণ। এসব জেলে সরকারি ভিজিএফ সহায়তা ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময় মানবেতর জীবনযাপন করেন।
আরও পড়ুন
যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট
হিজলার জেলে জালাল উদ্দিন, ইউনুস মাঝি ও শাহাদাত হোসেন বলেন, এ বছর সরকারি চাল সঠিকভাবে পেলেও তিন মাস মাছ ধরতে না পারায় শুধু এই সহায়তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয়নি।
হিজলা উপজেলার জেলে জালাল উদ্দিন বলেন, সরকারি চাল পেয়েছি, তবে তা দিয়ে কয়েক দিনের বেশি সংসার চলে না। বছরের বড় একটা সময় নদীতে নামতে না পারলে আমাদের হাতে কোনো কাজও থাকে না। তখন বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকেই টাকা নিতে হয়।
মেহেন্দীগঞ্জের জেলে ইউনুস মাঝি জাগো নিউজকে বলেন, মাছ কম পেলেও ঋণের কিস্তি ঠিকই দিতে হয়। বাজারে ভালো দাম থাকলেও আমরা অন্য কোথাও মাছ বিক্রি করতে পারি না। দাদন নেওয়ার শর্তেই নির্দিষ্ট আড়তে মাছ দিতে হয়।
‘জেলেরা ব্যাংক ঋণ নিতে চাইলে মৎস্য বিভাগ সহযোগিতা করবে। ব্যাংক ঋণের সুযোগ বাড়ানো গেলে দাদনের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জেলেরা মাছের ন্যায্যমূল্যও পাবেন।’
মেহেন্দিগঞ্জের বড়জালিয়া এলাকার জেলে শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রতিবছরই ভাবি এবার ঋণমুক্ত হবো। কিন্তু মৌসুম শেষে হিসাব করলে দেখা যায় সুদই বেড়েছে। সংসারের খরচ, জালের মেরামত আর ট্রলারের তেলের জন্য আবারও নতুন করে দাদন নিতে হয়।
বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোলাইমান জমদ্দার বলেন, বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে নিতে জেলেরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত। মাছের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, জেলেরা ব্যাংক ঋণ নিতে চাইলে মৎস্য বিভাগ সহযোগিতা করবে। ব্যাংক ঋণের সুযোগ বাড়ানো গেলে দাদনের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জেলেরা মাছের ন্যায্যমূল্যও পাবেন।
আরও পড়ুন
খাতা-কলমে ইলিশ তিনগুণ, বাজারে শূন্য
বরিশাল পোর্ট রোড মহানগর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক-সমিতির সভাপতি মো. জহির শিকদার বলেন, তেলের সংকট ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ সময় জেলেরা মাছ ধরতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ না পাওয়ায় জেলে পরিবারগুলোর দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক কামরুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, বিভাগের ছয় জেলার নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০৭ দশমিক ৩৬০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইলিশ প্রকল্পের আওতায় একজন জেলে চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনি ও আলুসহ ৪০ কেজি খাদ্যসামগ্রী পান।
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, জেলেদের জন্য সরকারের খাদ্যসহায়তা ও বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলে অনেক পরিবারের জন্য এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে পড়ে। ফলে অনেক জেলে সংসারের খরচ, নৌকা মেরামত, জাল কেনা ও মাছ ধরার প্রস্তুতির জন্য মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন, জেলেদের জন্য সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা দাদনের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমাতে পারবেন। একই সঙ্গে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, সরকারি সহায়তার পরিধি সম্প্রসারণ এবং সচেতনতা বাড়ানো গেলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও উন্নতি হবে।
এনএইচআর








