টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিন উপজেলার ৮০-৯০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে। সরকারি হিসাবে সাড়ে সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এখনো পানিবন্দি রয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের প্রতিটিই প্লাবিত। উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে, পানিবন্দি প্রায় চার লাখ মানুষ। বাঁশখালী ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও তলিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি জমি, মাছের ঘের—সবকিছু পানিতে নিমজ্জিত।শুক্রবার বাঁশখালীতে পানিতে ভেসে গেছে দুই শিশু। নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। পানির তীব্র স্রোতে বহু মাটির ঘর ধসে গেছে, ভেসে গেছে আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও গবাদিপশু।পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় নিয়েছেন হাজারো পরিবার।সাতকানিয়ার সৈয়দপুর গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সবকিছু পানিতে চলে গেছে। তিন দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে চলেছি। বাচ্চাদের জন্য দুধ নেই, ওষুধ নেই।’দুর্যোগের শুরু থেকেই উদ্ধার কাজে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। জেলা প্রশাসন ৫৫০ টন চাল ও ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ৭০০ টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুক্রবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে জরুরি ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে সব ধরনের সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন।বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। রেললাইন প্লাবিত হওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ।জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আউশ ধান, ৪৯০৭ হেক্টর সবজি ও ৬৫২ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। মৎস্য খাতে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি ঘের তলিয়ে গেছে- ক্ষতি প্রায় ৯১ কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদে ২৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে; মারা গেছে ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল ও ৪৩ হাজার মুরগি।স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বর্ষায় দক্ষিণ চট্টগ্রামে এমন বন্যা হয়। নদী খনন, পানি নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা ও টেকসই বেড়িবাঁধ না করলে এই দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও বন্যা বাড়ছে জানিয়ে দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন।