চলতি বছরের রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিন্স : ওয়ানস আপন এ টাইম ইন ঢাকা’ ছিল বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা। নব্বইয়ের দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধ জগৎ, গ্যাংস্টার কালচার এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে সিনেমার মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে। মুক্তির আগে আবু হায়াত মাহমুদ পরিচালিত এ সিনেমা ঘিরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। শাকিব খানের জনপ্রিয়তা, জমকালো গান, বড় বাজেট ও অ্যাকশনধর্মী উপস্থাপনা, সব মিলিয়ে এটিকে সম্ভাব্য ব্লকবাস্টার হিসাবেই দেখছিলেন অনেকেই। কিন্তু মুক্তির পর দর্শক প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র থেকে নেতিবাচক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গল্পের দুর্বলতা, চিত্রনাট্যের অসংগতি এবং চরিত্র নির্মাণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। প্রথম সপ্তাহে কিছু দর্শক টানলেও সিনেমা দীর্ঘমেয়াদে প্রেক্ষাগৃহ ধরে রাখতে পারেনি। ফলে প্রত্যাশিত ব্যবসা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রিন্স’-এর প্রধান সমস্যা ছিল কনটেন্ট। দর্শক এখন শুধু নায়ককেন্দ্রিক দৃশ্য বা অ্যাকশন দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন না; তারা একটি পরিপূর্ণ সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা চান। সেই জায়গায় সিনেমাটি বেশ পিছিয়ে ছিল।

ঠিক দুমাস পরই শাকিব খানের ক্যারিয়ারে আরও একটি ধাক্কা লাগে। কুরবানির ঈদে মুক্তি পাওয়া আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’কে অনেকেই তার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসাবে দেখেছিলেন। কারণ, ‘প্রিন্স’-এর ব্যর্থতার পর নতুন সিনেমা নিয়ে দর্শকের কৌতূহল ছিল। কিন্তু ‘রকস্টার’ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। মুক্তির পর প্রথম কয়েকদিন কিছু প্রেক্ষাগৃহ দর্শক পেলেও দ্রুত আগ্রহ কমে যায়। এ সিনেমাটিরও গল্প, নির্মাণশৈলী এবং চরিত্রের গভীরতা নিয়ে সমালোচনা হয়। অনেক দর্শকের অভিযোগ ছিল, এটি নতুন কিছু দিতে পারেনি; বরং পুরোনো ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর দুই ঈদে শাকিব খানের দুটি বড় সিনেমা কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। একজন সুপারস্টারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

শাকিব খানের এ দুই সিনেমার ব্যর্থতার পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, তারকাখ্যাতির যুগ কি তবে বদলে যাচ্ছে? একসময় বাংলাদেশে একটি সিনেমার সবচেয়ে বড় বিক্রয়যোগ্য উপাদান ছিল নায়ক বা নায়িকা। গল্প বা নির্মাণ নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন না তুলেও দর্শক প্রিয় তারকার সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক কনটেন্টের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত মতামত বিনিময়ের ফলে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, শক্তিশালী গল্প ও নির্মাণশৈলী থাকলে নতুন মুখ কিংবা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় শিল্পী অভিনীত সিনেমাও আলোচনায় এসেছে। আবার বড় তারকা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল কনটেন্টের সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়েছে (যেমন-শাকিব খানের প্রিন্স ও রকস্টার)। অর্থাৎ দর্শক এখন সিনেমাকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ হিসাবে বিচার করছেন। এ বাস্তবতায় শাকিব খানের জনপ্রিয়তা এখনো বিশাল হলেও সেটি আর এককভাবে সাফল্যের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। ঠিক এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, শাকিব কি দর্শকপ্রিয়তা হারাচ্ছেন? এ প্রশ্নের উত্তর এতটা সরল নয়। বাস্তবতা হলো, শাকিব খান এখনো বাংলাদেশের সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা। তার সিনেমা ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়, প্রযোজকরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, আর ভক্তদের মধ্যেও তাকে নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। তবে একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, তার ভক্তনির্ভর বাজারের বাইরে সাধারণ দর্শক এখন সিনেমার মান নিয়ে বেশি সচেতন। ফলে শাকিব খানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কমে গেছে বলা কঠিন হলেও তারকানির্ভর ব্যবসায়িক মডেল আগের মতো কার্যকর থাকছে না। অর্থাৎ সমস্যাটা হয়তো শাকিব খান নন; বরং তার জন্য তৈরি করা সিনেমাগুলোর মান ও পরিকল্পনা।

এদিকে ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’-এর ফলাফল ঢালিউডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রি একজন তারকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল। এতে গল্প, চিত্রনাট্য উন্নয়ন ও গবেষণার জায়গাগুলো অনেক সময় অবহেলিত থেকেছে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, শুধু তারকা নয়, দর্শক এখন ভালো গল্প, মানসম্মত নির্মাণ, আধুনিক উপস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র চান। যারা এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে, তারাই বাজারে টিকে থাকবে। এ কারণে সিনেমাসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এই ব্যর্থতাগুলো আসলে ঢালিউডের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কনটেন্টকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় না গেলে ভবিষ্যতে বড় বাজেটের সিনেমাগুলো আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। ঠিক এই কারণে, ‘সোলজার’-এর সামনে এখন বড় পরীক্ষা। এখন সবার নজর শাকিব খানের পরবর্তী এই সিনেমার দিকে। কারণ, পরপর দুই সিনেমার ব্যর্থতার পর এটি শুধু একটি নতুন সিনেমা মুক্তি নয়; বরং শাকিব খানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। যদি সাকিব ফাহাদ পরিচালিত ‘সোলজার’ শক্তিশালী গল্প, উন্নত নির্মাণ এবং দর্শক-প্রত্যাশা অনুযায়ী কনটেন্ট উপহার দিতে পারে, তাহলে আগের দুই সিনেমার ব্যর্থতা দ্রুতই ভুলে যেতে পারে দর্শক। কিন্তু যদি একই ধরনের দুর্বলতা থেকে যায়, তাহলে তারকানির্ভর বাজার আরও বড় ধাক্কা খেতে পারে। সিনেমা বিশ্লেষকদের মতে, ‘সোলজার’-এর সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু একটি সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; এটি নির্ধারণ করবে ঢালিউডে এখনো কি তারকার নামই সবচেয়ে বড় শক্তি, নাকি কনটেন্টই হয়ে উঠেছে নতুন রাজা।

অবশ্য শাকিব খানের ক্যারিয়ারে উত্থান-পতনের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও তিনি সমালোচনার মুখে পড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাই ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’-এর ব্যর্থতা দিয়ে তার অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়া হবে। তবে এ দুটি সিনেমা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, বাংলাদেশে সিনেমার দর্শক বদলে গেছেন। তারা এখন শুধু সুপারস্টারের উপস্থিতি নয়, একটি ভালো সিনেমা দেখতে চান। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শাকিব খান ও ঢালিউড, দুটোকেই নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করতে হবে।