আবারও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি। বিশ্ববাজারের এই নতুন সংকট স্বভাবতই বাংলাদেশের জ্বালানি তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারকে নতুন করে গভীর ভাবনায় ফেলেছে। আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশের জন্য এ পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা বিগত চার মাসের আর্থিক খতিয়ান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শুধু বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে কম দামে বিক্রির কারণে সরকারকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এর সিংহভাগ তথা ২১ হাজার কোটি টাকাই মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান, আর বাকিটা গেছে এলএনজির উচ্চমূল্য পরিশোধে।
সোমবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-বৈশ্বিক এই সংকটের মধ্যেই সরকার ‘জি-টু-জি’ (সরকার টু সরকার) প্রক্রিয়ায় ১৬ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার চূড়ান্ত সমঝোতা শেষ করেছে, যা উন্মুক্ত দরপত্রের চেয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা কম প্রিমিয়ামে বা সাশ্রয়ী জাহাজ ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিরূপ প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে শুরু করলে এই চুক্তির প্রকৃত ব্যয় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা মুশকিল। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ না পাওয়ায় পেট্রোবাংলাকে সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির প্রভাবে যে এলএনজি ইউনিটপ্রতি ২৮ ডলার থেকে ১৬-১৭ ডলারে নেমে এসেছিল, হরমুজ বন্ধের পর তা আবারও আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
এমতাবস্থায়, অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলা ও বিপিসিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। স্বস্তির বিষয়, বর্তমানে দেশের ডিপোগুলোতে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে-ট্যাংকিতে ৩৪ দিনের ডিজেল এবং প্রায় ৪০ দিনের অকটেন মজুত আছে। তা সত্ত্বেও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিপিসিকে এখন থেকেই তাদের নিজস্ব তহবিলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি ভর্তুকি বা নগদ তারল্য সহায়তার নিশ্চয়তা পেতে হবে। কারণ, গত চার মাসে সরকার এক টাকাও ভর্তুকি না দেওয়ায় বিপিসিকে তাদের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের (যেমন ইস্টার্ন রিফাইনারি-২) বরাদ্দ করা অর্থ তেল আমদানিতে ডাইভার্ট করতে হয়েছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
হরমুজ প্রণালির এই নতুন সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বৈশ্বিক ভূরাজনীতির যে কোনো আকস্মিক ওঠানামা আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে কতটা তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এবার আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন দর ও সরবরাহ চেইনের গতিপ্রকৃতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখার পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত বিপিসির ভর্তুকির অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একইসঙ্গে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বাজেটের আগাম ব্যবস্থা রাখাও জরুরি। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার এই প্রভাব যেন দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতির ওপর এসে না পড়ে, নীতিনির্ধারকদের এখনই সেই দূরদর্শী ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করতে হবে।








