উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে তাদের বড় একটি অংশই পড়াশোনা শেষ করে আর দেশে ফিরছে না। উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, উচ্চ বেতন, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ এবং উন্নতমানের জীবন আকর্ষণে তারা বিদেশেই ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। ফলে দেশের তরুণ মেধাবীদের আলোয় আলোকিত হচ্ছে বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, হাসপাতাল, প্রযুক্তিসহ নানা প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে দেশে সীমিত গবেষণা, দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সংকট ও অনিরাপদ পরিবেশ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্র এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। এসব সীমাবদ্ধতায় দেশে ফেরার আগ্রহ কমে যাচ্ছে তাদের। ফলে উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশে থেকে যাওয়ায় দেশে মেধা পাচারের আশঙ্কা আরও প্রকট হচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু বাংলাদেশির দেশে ফেরার আগ্রহ নতুন আশার জন্ম দিলেও বাস্তবে সেই প্রবণতা এখনো দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতাও।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরে আসেন, সে বিষয়ে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সাধারণত শর্তসাপেক্ষে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে যান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তাদের মধ্যে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার হার তুলনামূলক কম, যা সংশ্লিষ্টদের মতে প্রায় ২০ শতাংশ। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২ জন শিক্ষক পিএইচডির জন্য বিদেশে গেলেও তাদের মধ্যে ২৮ জন দেশে ফেরেননি।

অন্যদিকে যারা নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ বা ব্যক্তিগত অর্থায়নে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যান, তাদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নত কর্মসংস্থান, গবেষণার সুযোগ ও স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনার কারণে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে আর দেশে ফিরে আসে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা দেন। তাদের মতে, এদের উল্লেখযোগ্য অংশই বিদেশে থেকে যায়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া কোনো সমস্যা নয়। এটা একটি জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। যদি সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর মতো পরিবেশ তৈরি হয়। দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা গেলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, দেশের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন, গবেষণার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে তরুণদের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন। শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রিচিতা খন্দকার রিফাত। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আনামিকা আহমেদ কাজ করছেন মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী গাজী মোহাইমিন ইকবাল মেটা এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) শিহাব রশিদ অ্যাপলে কর্মরত রয়েছেন। এভাবে বিশ্বের বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের মেধাবী তরুণরা।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তাদের ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত শুধু বেশি বেতনের জন্য নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ এবং জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়া সাইদুর রহমান বর্তমানে সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি বলেন, পেশাগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিক থেকে আপাতত যুক্তরাজ্যই বেশি সম্ভাবনাময়।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নেওয়া মো. ইউসুফ। পড়াশোনা শেষ করে সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের পরিবেশ নেই। বেতন-ভাতাদিও খুব একটা মানসম্মত নয়। তবে পেশাগত নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ তৈরি হলে ভবিষ্যতে দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করব।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মেধা পাচারের (ব্রেন ড্রেন) অন্যতম কারণ গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত পরিবেশ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো পরিকল্পিতভাবে বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করছে। তাদের অভিবাসন নীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। কারণ, আধুনিক অর্থনীতিতে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এ কারণে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, হাসপাতাল ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি পেশাজীবীরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

তারা বলছেন, ব্রেন ড্রেনের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর। এতে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটিই ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’, যেখানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তৈরি হওয়া দক্ষ মানবসম্পদের সুফল শেষ পর্যন্ত অন্য দেশ ভোগ করে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও আয়ারল্যান্ডও একসময় একই সংকটে পড়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এসব দেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিয়েছে।

গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আইআইটিতে রিসার্চ পার্ক, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস, আকর্ষণীয় ফেলোশিপ ও গবেষণা অনুদানের মাধ্যমে বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দেশে ফেরাতে কাজ করেছে ভারত। একই সঙ্গে ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চীনও বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম, গবেষণা অনুদান, আবাসন সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশফেরত গবেষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুর উচ্চমানের শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ, দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং আয়ারল্যান্ড বহুজাতিক বিনিয়োগ এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখতে সফল হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মেধা ধরে রাখতে শুধু দেশপ্রেমের আহ্বান নয়, প্রয়োজন উন্নত গবেষণা, প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।

বাংলাদেশেও সরকার এখন ‘ব্রেন ড্রেন’ নয়, ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের গবেষণা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশে যাওয়া তরুণদের ফিরে এসে দেশের সেবায় কাজের পরিবেশ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, ‘ব্রেন ড্রেন নয়’, ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ করতে হবে। আমাদের দেশের সন্তানরা বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষিত হবে। সেখান থেকে তারা আবার দেশে ফিরে আসবে। মানবতার সেবায় কাজ করবে। এতে আমাদের দেশের উন্নয়ন হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা চাই ‘ব্রেন ড্রেন’ বন্ধ করে এটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করতে। প্রবাসে থাকা দক্ষ গবেষক ও একাডেমিকদের জয়েন্ট রিসার্চ ও শর্ট কোর্সের মাধ্যমে দেশের গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সরকার মেধাবীদের দেশে ফেরাতে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।