ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন সাবেক শিক্ষার্থীকে মারধর, মোটরসাইকেল আটকে রাখা এবং টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম সাজিদ শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে দুই দফায় শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে একজনকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি দৌড়ে শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ঘটনাগুলো গত ১৪ মে এবং ১৬ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর, মল চত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন এলাকা ও শাহবাগে ঘটে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগের বেশিরভাগই অস্বীকার করেছেন।
ভুক্তভোগীরা হলেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ফারদিন খান, আব্দুর রহিম সাজিদ ও মোর্শেদ আহমেদ। তিনজনই ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে সাজিদ একই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ফারদিন বর্তমানে অন্য একটি কলেজ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে মোর্শেদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাজিদের জিহ্বা, চোখ, ঘাড় ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ফারদিনের চোখ, নাক, কান, ঠোঁটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। মোর্শেদের হাত ও পিঠেও আঘাত রয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার পর তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন—২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হলের ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজ (ইএসওএল) বিভাগের আল শামস, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সাদমান সাকিব, সূর্যসেন হলের মাশরুর কামাল মাহি ও শিব্বির আহমেদ, ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অভি রহমান, একই হলের সাইফুর রসুল পলাশ ও ফারসি ভাষা বিভাগের তামজিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের হীরা রহমান। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নানা কর্মসূচিতে দেখা গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, গত ১৪ মে সংঘটিত মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাতেও আল শামস, মাশরুর কামাল মাহি, শিব্বির আহমেদসহ একই দলের আরো কয়েকজন জড়িত ছিলেন।
এছাড়া, অভিযোগপত্রে নাম না থাকলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, ছবি দেখে তারা ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিহাব, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সানিয়াত শুভ এবং অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অমিত হাসান অমিকে হামলায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
একাধিক ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভিযুক্তদের কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত এবং সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী ফারদিন খানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে ১৪ মে তিনি ও তার বন্ধু আব্দুর রহিম সাজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় আল শামসের নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের আটকে ‘বহিরাগত’ পরিচয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
ফারদিনের দাবি, তার মোটরসাইকেলে হর্ন না বাজানো সত্ত্বেও হর্ন বাজানোর অভিযোগ তুলে তাকে আটকানো হয়। পরে তার মোটরসাইকেল প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট আটকে রাখা হয় এবং মানিব্যাগে থাকা ৭ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় তাকে থাপ্পড় মারা হয়। সাজিদ প্রতিবাদ করলে তাকেও হুমকি দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সিনিয়র শিক্ষার্থী এসে বিষয়টি মীমাংসা করেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
ফারদিন জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বন্ধু মোর্শেদ ঢাকায় আসায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের আটজন বন্ধু ভিসি চত্বরে জড়ো হন। এ সময় আল শামসের নেতৃত্বে কয়েকজন এসে আগের ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং মোটরসাইকেলের চাবি চান। চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কয়েকটি থাপ্পড় মারা হয় এবং মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাওয়া হয়। ফারদিনের দাবি, মোটরসাইকেলটি বিজয় একাত্তর হলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি ভিডিওতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সানিয়াত শুভকে সেটি চালিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
তিনি আরো জানান, পরে তাকে আব্দুর রহিম সাজিদকে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে আনতে বাধ্য করা হয়।
আব্দুর রহিম সাজিদ অভিযোগ করেন, বন্ধুর ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে ১৫ থেকে ২০ জন তাকে ঘিরে ধরে। পরে তাকে মধুর ক্যান্টিন হয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পেছনের নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে থাপ্পড়, ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। এরপর তাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তিনি জানান, সুযোগ বুঝে দৌড়ে শাহবাগ থানায় গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়। শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার তৌকির আহাম্মেদ বলেন, হঠাৎ করে একজন তরুণ দৌড়ে থানায় আসে। পরে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করে চলে যায়। তখন পুরো ঘটনার বিস্তারিত আমাদের জানা ছিল না।
ফারদিনের দাবি, পরে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি আবার ভিসি চত্বরে ফিরে যান। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের সামনেই তাকে আবার মারধর করা হয় এবং সাজিদকে ডেকে আনতে বলা হয়।
অন্যদিকে সাজিদের ভাষ্য, ফারদিনের ফোন পেয়ে ফিরে আসার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন তাকে অতর্কিতভাবে মারধর করেন। পরে তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।
ঘটনার পরদিন শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন আব্দুর রহিম সাজিদ। অভিযোগে তিনি বলেন, ১৬ জুলাই রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ভিসি চত্বরে অবস্থানকালে তার বন্ধু ফারদিনকে মারধর করা হয়। পরে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর, টাকা দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। সুযোগ পেয়ে তিনি শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন।
এ বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত আল শামস বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অনেকটাই সঠিক নয়। ছিনতাই, টাকা নেওয়া বা জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তার দাবি, রহিম আগে তাদের কয়েকজনের গায়ে হাত তুলেছিলেন। পরে বিষয়টি মীমাংসাও হয়েছিল। কিন্তু এরপর অন্যরা এসে তাদের হুমকি দেয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা শুধু কথা বলছিলাম। তাকে মারধর বা অপহরণের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। পরে সে নিজেই শাহবাগ থানায় যায়।”
মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “বাইকটি কেন নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আমি জানি না।”
সানিয়াত শুভ মোটরসাইকেল চালিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। হীরা রহমান দাবি করেন, তিনি মারধরের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না। অভি রহমান বলেন, তিনি তখন জিমে ছিলেন। সাদমান সাকিবও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গনেশ চন্দ্র রায় সাহস জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন জানান, অভিযোগের বিষয়ে তিনি তথ্য-প্রমাণ দেখে যাচাই করবেন।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খান বলেন, তিনি বর্তমানে ঢাকার বাইরে রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের কাছে থাকা তথ্য-প্রমাণ তাকে পাঠাতে বলেছেন এবং ঢাকায় ফিরে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী মোরাল পুলিশিং, ছিনতাই বা এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে না। কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।”








