বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একসময় নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে শুধু ভর্তি নয়, একাডেমিক উৎকর্ষের প্রায় সব সূচকেই তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন। সিজিপিএ, ডিনস অ্যাওয়ার্ড, গবেষণা, প্রেজেন্টেশন, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই নারী শিক্ষার্থীদের সাফল্য ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

এরই প্রতিফলন দেখা গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাম্প্রতিক একাডেমিক পরিসংখ্যানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম ডিনস অ্যাওয়ার্ডে নির্বাচিত সেরা ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনই নারী। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৪১টি বিভাগে পুরুষ শিক্ষার্থীদের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীদের গড় সিজিপিএ বেশি।

শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত অধ্যয়ন, নিয়মিত একাডেমিক চর্চা এবং শিক্ষার প্রতি নারীদের ক্রমবর্ধমান মনোযোগের ফল। তবে শ্রেণিকক্ষে এই সাফল্য যতটা দৃশ্যমান, কর্মক্ষেত্রে তার প্রতিফলন এখনো ততটা দেখা যায় না।

ডিনস অ্যাওয়ার্ডেও নারীদের আধিপত্য

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আধিপত্য থাকলেও এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের পাশাপাশি বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক বিভাগেও মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছেন। অনেক বিভাগেই প্রথম শ্রেণি, সর্বোচ্চ সিজিপিএ এবং ডিনস অ্যাওয়ার্ডের তালিকায় নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি।

গত ২৩ এপ্রিল সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সেখানে সেরা ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনই নারী। তারা হলেন—অর্থনীতি বিভাগের নাফিসা ইয়াসমিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বর্ষা রাণী মণ্ডল, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সানজিদা ফারজানা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রিফাহ রাফিয়া বারী, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের রাজিয়া সুলতানা পারুল, লোকপ্রশাসন বিভাগের মমতাজ ফারজানা তিথি, নৃবিজ্ঞান বিভাগের জান্নাতুল মাওয়া শিন, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের তৃষা দাশ এবং সমাজকর্ম বিভাগের অন্তরা। একমাত্র পুরুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আশরাফুল খান ফয়সাল ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

শুধু ডিনস অ্যাওয়ার্ড নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণেও দেখা যায়, অধিকাংশ বিভাগে গড় সিজিপিএর দিক থেকেও নারী শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।

কেন এগিয়ে যাচ্ছেন নারী শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, পরিকল্পিত পড়াশোনা, সময়ানুবর্তিতা এবং ধারাবাহিক একাডেমিক চর্চাই নারী শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।

রাবির জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের মতে, অধিকাংশ নারী শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন এবং পুরো সেমিস্টারজুড়ে ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করেন। পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির পাশাপাশি তারা অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, টার্ম পেপার এবং ক্লাস পারফরম্যান্সেও সমান গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি পরিবারের ইতিবাচক মনোভাব, সমাজে নারীদের শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অনলাইন শিক্ষা উপকরণ এবং গবেষণার সুযোগ তাদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

তাদের মতে, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সময়মতো একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রবণতা স্পষ্ট। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, নোট প্রস্তুত, শিক্ষকদের সঙ্গে একাডেমিক যোগাযোগ এবং নির্ধারিত সময়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার অভ্যাস তাদের ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে অনেক পুরুষ শিক্ষার্থী চাকরির প্রস্তুতি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করায় একাডেমিক ফলাফলে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছেন।

ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মমতাজ ফারজানা তিথি বলেন, “এ অর্জন আমাকে আরো ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগাবে। এর পেছনে শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা, পরিবারের সমর্থন এবং নিয়মিত অধ্যয়নের বড় ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে নারী শিক্ষার্থীরা শুধু ডিনস অ্যাওয়ার্ড বা ভালো ফলাফলের ক্ষেত্রেই নয়, গবেষণা, প্রশাসন ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন।”

তিনি আরো বলেন, “সময়ানুবর্তিতা, পরিকল্পিত পড়াশোনা এবং একাডেমিক দায়িত্ব পালনে বেশ আন্তরিক নারী শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি শেখার আগ্রহ, আত্মনির্ভর হওয়ার দৃঢ় মানসিকতা এবং সমাজে নিজেকে প্রমাণ করার প্রবল ইচ্ছাও তাদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। পরিবার ও সমাজে নারীদের শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও আগের তুলনায় বেড়েছে। আমি বিশ্বাস করি, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে যেকোনো শিক্ষার্থী নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।”

ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বর্ষা রাণী মণ্ডল বলেন, “এ অর্জনের পেছনে নিয়মিত ক্লাস, পরিকল্পিত পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের সহযোগিতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। মেয়েরা সুযোগ পেলে যে কোনো ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে। এই স্বীকৃতি আমাদের আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেবে।”

একই সময়ে ‘সেরা প্রবন্ধ’ লেখক হিসেবে ডিনস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া লোকপ্রশাসন বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মো. আওয়াল হোসেন মোল্যা বলেন, “নারী শিক্ষার্থীদের এ সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ধারাবাহিক পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও পরিকল্পিত একাডেমিক চর্চার স্বাভাবিক ফল।”

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করলেও কর্মক্ষেত্রে সেই সাফল্যের প্রতিফলন সবসময় সমানভাবে দেখা যায় না। বাংলাদেশে নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ও একাডেমিক সাফল্য বাড়লেও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, গবেষণায় নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব এবং উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সাফল্যকে বাস্তব কর্মজীবনের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের নারী শিক্ষার্থীরা একাডেমিক উৎকর্ষতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। ডিনস অ্যাওয়ার্ড কিংবা সিজিপিএ—এসব অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও ইতিবাচক একাডেমিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন। তাদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিয়মিত অধ্যয়ন, সময় ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা এবং শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, “ডিনস অ্যাওয়ার্ডে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন নারী নির্বাচিত হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, নারী শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করছে এবং একাডেমিক বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক। মেয়েরা শুধু ভালো ফলই করছে না, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন একাডেমিক প্রতিযোগিতাতেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “ডিনস অ্যাওয়ার্ডে নারী শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। আমাদের শিক্ষার্থীরা মেধা, অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে, আর নারী শিক্ষার্থীরা সেই ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।”

তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছি, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে এবং নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বিকাশ করতে পারবে। তবে ভালো ফলাফল অর্জনই শেষ লক্ষ্য নয়; এই মেধাকে গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্বে রূপান্তরিত করাই আমাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। আমি বিশ্বাস করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”