জুলাই আন্দোলনে শহীদ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের দ্বিতীয় শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই শহিদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

শনিবার (১৮ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী এসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

দিবসের প্রধান আয়োজন হিসেবে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে ‘জুলাই বিপ্লব থেকে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন, শহিদ মীর মুগ্ধের পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহিদ সাকিব রায়হানের পিতা শেখ আজিজুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশীদ খান এবং ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নূরুন্নবী। স্বাগত বক্তব্য দেন দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। বাক্‌স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে এ আন্দোলনের জন্ম, সেই চেতনা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “নতুন করে যেন ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে জন্য জুলাই সনদ ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন জরুরি।” শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ এবং সেটির নাম শহীদ মীর মুগ্ধের নামে রাখার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণেও উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, “মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে পানি তুলে দিয়ে মীর মুগ্ধ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার আত্মত্যাগ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ানোর প্রেরণা হয়ে থাকবে।” তিনি জুলাই শহিদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, “মীর মুগ্ধের আত্মত্যাগ নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত করেছে।” তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের স্বার্থে মৎস্য ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হস্তান্তর এবং শহিদ মীর মুগ্ধের নামে আবাসিক হল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নামকরণ শহিদ মীর মুগ্ধের নামে করায় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।

খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “ভবিষ্যতে জুলাইযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। মীর মুগ্ধের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবে।”

বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, “বিলাসী জীবনযাপনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মীর মুগ্ধ আন্দোলনে রাজপথে নেমেছিলেন এবং তৃষ্ণার্ত মানুষের মধ্যে পানি বিতরণ করতে গিয়ে শহিদ হন। জুলাই শহিদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. হারুনর রশীদ খান বলেন, “মীর মুগ্ধদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে ন্যায়, সাহস ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।”

ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নূরুন্নবী বলেন, “দেশের অন্যতম স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলেও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ভূমির সংকট।” তিনি শহিদ মীর মুগ্ধের নামে আবাসিক হল প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

আলোচনা সভায় শিক্ষকদের পক্ষে বক্তব্য দেন গণিত ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক মো. আজমল হুদা। শিক্ষার্থীদের পক্ষে অনুভূতি ব্যক্ত করেন আইন ডিসিপ্লিনের ২০১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার এবং গণিত ডিসিপ্লিনের ২০২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি সংসদ সদস্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে শহীদ মীর মুগ্ধের স্নাতক পরীক্ষার সনদ তার পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি শহিদ মীর মুগ্ধ ও শহিদ সাকিব রায়হানের পরিবারকে সম্মাননা জানানো হয় এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। আলোচনা সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম ক্বারী মুস্তাকিম বিল্লাহ। পরে জুলাই শহিদদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় অদম্য বাংলা চত্বরে জুলাই আন্দোলনের স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। পরে অতিথিরা প্রদর্শনী পরিদর্শন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

দিনব্যাপী কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কুলের ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতারা, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাদ মাগরিব বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।