রাজধানী ঢাকার চারপাশে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার নৌপথ আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু দেড় দশক আগে এই কাজ করে ব্যর্থ হয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেখানে ঢালা অর্থের প্রায় পুরোটাই পানিতে গিয়েছিল।

নদীদূষণ ও দুর্বল পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং সবকিছুর ফল হিসেবে যাত্রী না পাওয়ায় ওই নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চালু রাখা যায়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এবার অবশ্য আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বেসরকারি অংশীদারত্বে নৌযান চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।

নতুন পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁরা একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছেন এবং বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিতে দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর কোন ধরনের নৌযান চলবে, কতটি নৌযান প্রয়োজন হবে এবং কী ধরনের নীতিমালা লাগবে, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সচিব আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য আগামী তিন মাসের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত করা, তবে অগ্রগতি ভালো হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেও সিদ্ধান্ত হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার ল্যান্ডিং স্টেশন, রুট ও সময়সূচির মতো সহায়তা দেবে। আর নৌযান সংগ্রহ ও পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ওপর।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ্বরী নদী মিলিয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বৃত্তাকার নৌপথ একসময় যানজট নিরসনের সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট বাদামতলী-গাবতলী পথে এবং ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী পথে ওয়াটার বাস চালু করে। তিন দফায় মোট ১২টি ওয়াটার বাস নামানো হয়। এগুলো তৈরিতে ব্যয় হয় ৯ কোটি ২০ লাখ ৩২ হাজার ৩০৬ টাকা।

কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব বলছে, প্রকল্পটি শুরু থেকেই আর্থিকভাবে টেকসই ছিল না। বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, ওয়াটার বাস পরিচালনা থেকে আয় হয় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা, আর ব্যয় হয় ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা লোকসান।

এই অবস্থায় চালু না রাখতে পেরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী এবং ২০২০ সালের মার্চে বাদামতলী-গাবতলী পথে ওয়াটার বাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১২টি ওয়াটার বাসের মধ্যে মাত্র তিনটি এখনো সচল আছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দুটি আরিচা-কাজিরহাট রুটে ভাড়ায় চলছে।

সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওয়াটার বাস ব্যর্থ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না। বরং একাধিক সমস্যার কারণে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সড়কপথের প্রতিযোগিতা। গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক চালু হওয়ার পর ওই পথে বাস, মিনিবাস, লেগুনা ও বিআরটিসির দোতলা বাস যাত্রী পরিবহন করতে থাকে। বাদামতলী সেতুর নিচ থেকে প্রতিদিন শতাধিক যান চলাচল করত। ফলে যাত্রীরা কম সময়ে সড়কপথেই গন্তব্যে পৌঁছে যেত।

নৌপথ ব্যর্থ হওয়ার দ্বিতীয় বড় কারণ বুড়িগঙ্গার দূষণ। দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নৌভ্রমণে যাত্রীদের অনাগ্রহ তৈরি হয়।

এ ছাড়া গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশনের দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত ওঠানামার সুবিধা না থাকা এবং খোলামুড়া-বছিলা এলাকায় স্থানীয় ট্রলারমালিকদের বাধাও সেবাটিকে অকার্যকর করে তোলে।

নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী পথেও একই চিত্র ছিল। মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে পন্টুন ও অবকাঠামো না থাকায় ওয়াটার বাস ভেড়ানো যেত না। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী শাটল ট্রেন দ্রুত ও সুবিধাজনক হওয়ায় যাত্রীরা ট্রেনকেই বেশি বেছে নিত।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন, মূল সমস্যা ছিল পরিকল্পনায়। তিনি বলেন, অতীতে বৃত্তাকার নৌপথকে শুধু ওয়াটার বাস প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই উদ্যোগগুলো টেকসই হয়নি। যদি লক্ষ্য হয় সড়কের যানজট কমানো, তাহলে যাত্রীর বাসা থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথকে পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে, শুধু নৌযান কিনে চালু করলেই হবে না। টার্মিনাল সংযোগ, পার্কিং সুবিধা, নির্ধারিত বিরতিতে নৌযানের আসা-যাওয়া, যাত্রীবান্ধব নৌযান এবং নদীপথে অনিয়ন্ত্রিত ছোট নৌযান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুলাই বৃত্তাকার নৌপথ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে ১ আগস্ট বুয়েটের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নৌপথ পরিদর্শন করেন। ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয়।

এসব বৈঠকে প্রাথমিকভাবে গাবতলী-সদরঘাট নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে যাত্রীবাহী নৌযান চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে গাবতলী থেকে আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সদরঘাট ও বছিলা একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তাকার পথ বিবেচনায় রয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আবার বৈঠক হবে। তখন বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীবান্ধব নৌপরিবহনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীপথকে বাস, রেল ও সড়ক পরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় না করলে আগের মতো কয়েকটি নৌযান চালুর পর লোকসানের কারণে উদ্যোগটি আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলো যানজট নিরসন, পর্যটন ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এ জন্য খণ্ডিত নয়, সমন্বিত ও যাত্রীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। দেখার বিষয়, এবারের উদ্যোগে বৃত্তাকার নৌপথ নতুন করে ভেসে উঠবে, নাকি আগের মতো আবারও ডুবে যাবে।