দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক সংকট, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বাড়ছে মানসিক সংকট। এতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
গত ছয় অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ৩ হাজারের বেশি ব্যক্তি সেবা নিয়েছেন। মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২৩২ জন। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে পৌঁছায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা সামান্য কমে ৫২৩ জন হলেও পরবর্তী দুই বছরে যথাক্রমে ৫৪৩ ও ৫৪৯ জন সেবা নেন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিকিৎসা গ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭৩ জন। অর্থাৎ ছয় বছরে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে ছয় বছরে সেবাগ্রহীতাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেবা নেওয়া ৩ হাজার ৫৮ জনের মধ্যে ১ হাজার ৪৩৭ ছাত্র, ১ হাজার ৪২৩ ছাত্রী, ১০১ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৯৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৫৪১ জনকে স্বতন্ত্র কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা মোট ১০ হাজার ১৫২টি ব্যক্তিগত সেশন নিয়েছেন। এ ছাড়া ১ হাজার ৩৯৭ জনকে ২৬৪টি দলগত সেশন দেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধনের পরও ৩০২ জন কোনো সেশন গ্রহণ করেননি।
কর্তৃপক্ষ জানায়, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, প্যানিক ডিজঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি), সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, পার্সোন্যালিটি ডিজঅর্ডার, অমূলক ভীতি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, মাদকাসক্তি ও অটিজমসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসব সংকটের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি, মাদকসেবন, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন হয়রানি, শৈশবের মানসিক আঘাত, পরীক্ষায় খারাপ ফল, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিসহ নানা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কারণ কাজ করছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটর (অবৈতনিক) মেহেদী হাসান বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ২০ জন, অনেক সময় ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী কাউন্সেলিং নিতে আসেন। প্রথমে তাঁদের গোপনীয় তথ্যফরম পূরণ করানো হয়। এরপর একাধিক সেশনের মাধ্যমে সমস্যার ধরন শনাক্ত করা হয়।’
এদিকে তবে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত কাউন্সেলর ও জনবল না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটির ওপর চাপও বাড়ছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একজন ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটর ও তিনজন ইন্টার্নের মাধ্যমে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাঁরা সবাই অবৈতনিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, ‘বর্তমানে কেন্দ্রে একজন কাউন্সেলর এবং সমন্বয়ের দায়িত্বে কয়েকজন ইন্টার্ন কাজ করছেন। তাঁরা নামমাত্র ভাতা বা প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিচ্ছেন। ফলে জনবলসংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘স্থায়ীভাবে কাউন্সেলর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকর ও মানসম্মত সেবা পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকেও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। কারণ বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বাজেট প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ হয়নি।’
এদিকে বিষণ্নতার সঙ্গে সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনজনের আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। আর ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক সংকট, একাকিত্ব, আর্থিক চাপ, ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, ‘এটি শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বরং সারা দেশের একটি উদ্বেগজনক সমস্যা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও আত্মহত্যার মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।’
এদিকে ২০২৫ সালে হেলথ সায়েন্স রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে উচ্চমাত্রার, ২৯ শতাংশের মধ্যে মাঝারি মাত্রার এবং ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে নিম্নমাত্রার আত্মহত্যাপ্রবণতা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সম্পর্কে অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, ‘আত্মহত্যা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। শিক্ষাজীবনের চাপ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জনের উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে রাখছে।’







