বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি আগের পরিকল্পনামতো কয়লাচালিত না করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরেছে আড়াই হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। সরকারের ঘোষণামতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে কয়লার বদলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রিক এই প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটি বাস্তবায়ন করবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে পরিকল্পনা কমিশন তাদের পর্যবেক্ষণে প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাবের বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়নি উল্লেখ করে যথাযথভাবে এটি করার তাগিদ দিয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ৩ আগস্ট কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কয়েকটি শর্ত দিয়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কমিয়ে ২,৫০২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মেয়াদও আট মাস কমিয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, আমদানিনির্ভর কয়লা, গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রামপালে বর্তমানে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। সুন্দরবনের ওপর প্রভাব নিয়ে পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে ২৩ হাজার ৭১৪ কোটি টাকায় উঠেছিল। ৯১৫ দশমিক ৫ একর আয়তনের ব্লক-এতে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছে। বাকি ৯১৮ দশমিক ৫ একর আয়তনের ব্লক-বিতে একই ক্ষমতার দ্বিতীয় আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ২০১৬ সাল থেকে অব্যবহৃত থাকা ব্লক-বিতেই এখন বর্তমান সরকার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, ব্লক-বির অব্যবহৃত থাকা ৯১৮ দশমিক ৫ একর ভূমির মধ্যে সবুজ বেষ্টনী, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, নিম্নভূমি ও জলাধার সংরক্ষণের পর অবশিষ্ট প্রায় ৬৮৫ একরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত উপকেন্দ্রের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এ জন্য নতুন ২৩০ কেভি বে-এক্সটেনশন নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, দ্বিতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এতে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

ম তামিম বলেন, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন, নদীতীর সংরক্ষণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছে বলে এ প্রকল্পে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরে প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। পর্যালোচনা করে এর ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।

এ ছাড়া প্রকল্পের শুরুতেই সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্র ও ধাপে ধাপে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে খাল সংস্কার, বনায়ন এবং হাঁস-মুরগি পালনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পের জন্য পিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।

পিইসি সভায় প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পরামর্শের পাশাপাশি ব্যয়ের খাতেরও বিস্তারিত পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৯৭ শতাংশ অর্থই মূলধনি খাতে ব্যয় হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা (৩৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ) ব্যয় হবে সৌর ফটোভোল্টেইক (পিভি) মডিউল স্থাপনে। গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন, কেবল, সুইচগিয়ার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণে ১৯৩ কোটি ৬ লাখ টাকা, ভবন, ডরমিটরি ও রেস্টহাউস নির্মাণে ৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন ও বে-এক্সটেনশন নির্মাণে ৭০ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। যন্ত্রপাতি স্থাপন ও পরীক্ষা; নকশা ও প্রকৌশল সেবা; বিদেশে প্রশিক্ষণ ও যানবাহন কেনা এবং প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২২৯ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সভায় প্রকল্পের মেয়াদ ৮ মাস কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় এই প্রকল্পে খরচ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে জমির বহুমুখী ব্যবহারে লক্ষ্যে খাল সংস্কার, হাঁস-মুরিগ পালন এবং বনায়ন ঠিক রাখার জন্য বলা হয়েছে।

রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও এটি ঠেকাতে ব্যর্থ হন। শেখ হাসিনার সরকার তখন যুক্তি দেখিয়েছিল, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সংলগ্ন সুন্দরবনের ওপর এর প্রভাব হবে ন্যূনতম। তবে এ আশ্বাস বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। এমন প্রেক্ষাপটে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন কিছু বিষয়ে উদ্বেগও তুলে ধরেছে। পর্যালোচনায় কমিশন বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এই এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পশুর নদ ও সুন্দরবনের বাফার জোনসংলগ্ন এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত লবণাক্ততার প্রভাব, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়গুলো ডিপিপিতে পর্যাপ্তভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। এতে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে এসব বিষয় আরও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। আর বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান অংশই সৌরবিদ্যুৎ।

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০-৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ, সঞ্চয় এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি হবে।