ঢাকার নাম শুনলে এখনও চোখে ভাসে নৌকায় চলাচলের ছবি। একসময় যে শহরে খালের পর খাল বয়ে যেত, সেই ঢাকায় এখন ৩০-৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই থমকে যায় জীবন। মাত্র একশ বছরেই কীভাবে বদলে গেল গোটা চিত্র?মূলত, ঢাকার জলাবদ্ধতার ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছিল প্রায় শতাব্দী আগে এক ভুল সিদ্ধান্তে।বাংলার রাজধানী ঢাকা। নামটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য। আর এক সময় ঢাকা ছিল সত্যিই জলের শহর।সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল শাসনামলে ঢাকা সুবা-ই-বাংলার রাজধানী হয়ে ওঠে। তখন ঢাকা ছিল এক ‘উভচর’ শহর। খাল আর নদী মিলে ছিল শহরের প্রধান অবকাঠামো।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ধোলাই খাল। যা ছিল প্রতিরক্ষা, নিষ্কাশন আর বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র।নৌকায় চড়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া যেত।ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসনামলে ধারণায় আসে পরিবর্তন। দাঁড়িয়ে থাকা পানি যে রোগের বাহক, তা ভেবে নগর পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়, ‘পানি বের করে দেওয়া’। তখন থেকেই পানিকে বোঝা মনে করা শুরু হলো। এই মনোভাবই ধীরে ধীরে ঢাকাকে জলের শহর থেকে জল-বিরোধী নগরীতে রূপান্তরিত করলো।ঢাকার জলাবদ্ধতার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি লেখা হয় ১৯১৭ সালে। যখন বিশ্ববিখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ প্যাট্রিক গেডেস এসে পৌঁছেন ঢাকায়। তিনি দেখলেন, তৎকালীন সরকারি প্রকৌশলীরা শহরের সাড়ে ১২ মাইল খাল ভরাট করে ফেলার পরিকল্পনা করছেন। যার বিনিময়ে তারা উদ্ধার করবেন মাত্র ৫০ একর জমি।গেডেস ঘটনা দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।তিনি সেই পরিকল্পনাকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানালেন।পরামর্শ দিলেন খাল ভরাট নয়, বরং খালগুলোকে সংস্কার ও পুনরায় খনন করা উচিত। তিনি বলেছিলেন, এই খালগুলোই ঢাকার প্রাণ। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।তবে ব্রিটিশ প্রশাসন গেডেসের কথা পাত্তাই দিলেন না।উল্টো খাল ভরাটের কাজ শুরু করে দেয়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ‘ব্রিটিশ সরকারের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া আর গেডেসের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়েই ঢাকার আধুনিক জলাবদ্ধতার বীজ বপন করা হয়েছিল।ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হয় ঢাকায় খাল ভরাটের মহোৎসব। তখন দ্রুত জনসংখ্যা বাড়ছিল। সেই সঙ্গে বাড়ছিল আবাসনের চাহিদাও। ফলে খালের পর খাল ভরাট করে সেই আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে লাগলো।১৯৬০-এর দশকে প্রাচীন ধোলাই খালের অধিকাংশ অংশ ভরাট হয়ে যায়। এক সময়ের সেই জীবন্ত খাল এখন শুধুই ইতিহাস।মিরপুর রোড, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, রামপুরা ডিআইটি রোড- এসব আধুনিক সড়কের প্রতিটি তৈরি হয়েছে খাল ভরাট করেই। উত্তরা, বনশ্রী, পূর্বাচল- এসব জনপ্রিয় আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে জলাশয় ও নিচু ভূমি ভরাট করে করে।দেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮০-এর দশকের শেষ নাগাদ খাল-বিল ভরাট ও দখলে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। ঢাকায় জলাবদ্ধতার বীজ তখন ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।সেই ঘটনার বছর আটেক পর ১৯৮৮ সাল। ঢাকাবাসীর জন্য এক ভয়াবহ বর্ষা। ওই বছর ভয়াবহ বন্যায় রাজধানীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। সরকার তখন নতুন এক ‘সমাধান’ বের করল। খালের ওপর বক্স কালভার্ট (কংক্রিটের বড় পাইপ) নির্মাণ করে তার ওপর সড়ক তৈরি করা।১৯৯০-এর দশকে সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে সেগুনবাগিচা, গোপীবাগ, রায়েরবাজারসহ বহু খালের ওপর নির্মিত হয় বক্স কালভার্ট। কিন্তু প্রকৌশলীদের মতে, এই কালভার্টগুলোর নকশায় ছিল মারাত্মক ত্রুটি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো পলি ও আবর্জনায় ভরে যায়। যা জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ করে তোলে।শুধু খাল নয়, বন্যা প্রবাহ অঞ্চল- বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা নিচু জলাভূমিগুলোও ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্সের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে (২০০৯-২০১৯) রাজধানীর জলধারণ এলাকার ৫৭ শতাংশই হারিয়ে গেছে। যে শহরে একসময় খালের পর খাল ছিল, নৌকায় চলাচল ছিল স্বাভাবিক, সেই শহরেই এখন ৩০-৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই অর্ধেক এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে খাল পুনরুদ্ধার, বন্যা প্রবাহ অঞ্চল দখলমুক্তকরণ আর দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বক্স কালভার্ট যুগের সমাপ্তি টেনে খালগুলোকে আবার জলের প্রবাহ হিসেবে ফিরিয়ে আনা জরুরি।ফলে ঢাকার জলাবদ্ধতা আবহাওয়ার খামখেয়ালি কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রায় শতাব্দী ধরে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের বোঝা। এমনকি প্যাট্রিক গেডেসের সতর্কবাণীও রক্ষা করতে পারেনি ঢাকাকে।এখন সময় এসেছে, ঐতিহাসিক সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকাকে প্রাণপ্রকৃতি আর পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার।