বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যরা কোনো সভায় অংশগ্রহণ করলে বিধি অনুযায়ী সম্মানী ভাতা পান। এ জন্য সরকারের নির্ধারিত সুস্পষ্ট বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু ‘সিটি অ্যালাউন্স’ নামে কোনো ভাতা দেওয়ার বিধান নেই।

তবে রাজধানীর ঢাকা সিটি কলেজে গভর্নিং বডির সদস্যরা সিটি অ্যালাউন্সের নামে প্রায় ২ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এই অনিয়মের তথ্য পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।

অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা ২০২২ সালে এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তবে অধিদপ্তরের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী নিয়ামুল হক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা সিটি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যরা ‘সিটি অ্যালাউন্স’ নামে যে ভাতা নিয়েছেন, তা নেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তাঁদের মতে, বিধিবহির্ভূতভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ লুটপাটের উদ্দেশ্যেই ‘সিটি অ্যালাউন্স’ নামে এই ভাতা চালু করা হয়েছিল।

জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

১৯৫৭ সালে রাজধানীর মিরপুর রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা সিটি কলেজ। বর্তমানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। শিক্ষক আছেন ১৯৮ জন এবং কর্মচারী ৫৭ জন। প্রথমে কলেজটি সরকারি অনুদানভুক্ত ছিল, পরে তা এমপিওভুক্ত করা হয়। তবে ১৯৯৯ সালে এমপিও ফেরত দেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে কলেজটি।

আর্থিক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গভর্নিং বডির সভায় অংশ নেওয়ার বিপরীতে ‘সিটি অ্যালাউন্স’ নামে বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন সদস্যরা। মোট নয়টি অর্থবছরে (২০১২-২০১৩ থেকে ২০২০-২০২১) তাঁরা ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা নিয়েছেন ‘সিটি অ্যালাউন্স’ বাবদ, যা বিধিবহির্ভূত। এই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে কলেজে শিক্ষক নিয়োগেও ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জন শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ। এসব শিক্ষকের নিয়োগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো প্রতিনিধিও। প্রতিবেদনে এসব শিক্ষকের নিয়োগ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-২০১৩ থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যাংকে না রেখে নগদে খরচ করা হয়েছে; যা আর্থিক বিধির লঙ্ঘন।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, যাবতীয় আয়, বেতন, অনুদানসহ অন্যান্য খরচ ব্যাংকের মাধ্যমে খরচ করতে হবে। এ ছাড়া ৯ অর্থবছরে বিভিন্ন কাজের জন্য বিধি অনুযায়ী ভ্যাট কর্তন করা হয়নি। তাই বিভিন্ন কাজের ভ্যাট বাবদ ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা উৎসে করও সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।