টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। একসময় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টির পর পানি নেমে গেলেও এখন দিনের পর দিন জমে থাকছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। এতে সড়ক ডুবে গিয়ে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট, দখল ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে। উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি। এ জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
পানি নামছে না, থমকে গেছে জনজীবন
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, তারাবো, কাঞ্চন, ভুলতা, গোলাকান্দাইল ও মুড়াপাড়াসহ বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক বাড়ির নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। রান্নাঘর, শোবার ঘর ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হলেও গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
‘জলাবদ্ধতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে বাড়ির উঠানে ঘরে পানি জমে আছে। রান্নাঘরেও পানি। উন্নয়নের কত কথা শুনি কিন্তু বর্ষা এলেই বোঝা যায় বাস্তবতা কী। বৃষ্টি এলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমাদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই’
স্থানীয়রা বলেছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা গেলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং নতুন সড়ক ও ভবন নির্মাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পানি নিষ্কাশনের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
আরও পড়ুন
ময়মনসিংহ / পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ড্রেনের কাজ, বৃষ্টি হলে হাঁটুপানিতে নগরবাসী
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জলাবদ্ধতা এখন শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই বর্ষা শেষে নয়, বর্ষা শুরুর আগেই কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় কিছু নতুন প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে দ্রুত নগরায়ণ, অতিবৃষ্টি এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

গোলাকান্দাইল এলাকার বাসিন্দা মজিবর মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ড্রেন আছে নামকাহস্তে। দখল দুষণে খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। পানি যাওয়ার পথ নেই। তাইতো জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রতিবছর একই সমস্যা হলেও কেউ স্থায়ী সমাধান করছে না। উন্নয়নের বাণী শুনি কাজের কাজ কিছুই না।
কর্মহীন নিম্নআয়ের মানুষ, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
এই জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। পানি জমে থাকায় অনেকেই কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া স্কুলাগামী শিক্ষার্থীরা অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
‘আমার একটি মেয়ে প্রাথমিকে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। সে ভালো সাঁতার জানে না। পানি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়া করে। সারাক্ষণ ভয় লাগে পানিতে পড়ে গেলে না জানি কি হয়। দ্রুত এই জলাবদ্ধতার অবসান চাই’
শান্তিনগর এলাকার গৃহিণী সাহিদা আক্তার বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে বাড়ির উঠানে ঘরে পানি জমে আছে। রান্নাঘরেও পানি। উন্নয়নের কত কথা শুনি কিন্তু বর্ষা এলেই বোঝা যায় বাস্তবতা কী। বৃষ্টি এলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমাদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।
কর্ণগোপ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয় বাড়িঘরে পানি উঠে যায়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও পানি নামছে না। ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
আরও পড়ুন
হাজার কোটি টাকা খরচেও নামে না ঢাকার পানি, খাল-জলাশয় পুনরুদ্ধারে জোর
অভিভাবক সাইফুদ্দিন জানান, আমার একটি মেয়ে প্রাথমিকে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। সে ভালো সাঁতার জানে না। পানি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়া করে। সারাক্ষণ ভয় লাগে পানিতে পড়ে গেলে না জানি কি হয়। দ্রুত এই জলাবদ্ধতার অবসান চাই।
শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে স্কুলে আসে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় এখন তাদের পানি দিয়ে স্কুলে আসতে হয়। কখনো কেউ কেউ পড়ে ভিজে যায়। অনেকের পায়ে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। দ্রত জলাবদ্ধতার নিরসনের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হয়।
বাড়ছে পানিবাহিত রোগ
টানা জলাবদ্ধতার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ময়লা ও স্থির পানিতে চলাচলের ফলে জ্বর, সর্দি-কাশি, চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কর্ণগোপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিহা আক্তার বলেন, প্রতিদিন পানি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। কখনো কখনো পড়ে ভিজে যাই। পচা পানির কারণে আমার পায়ে ঘা হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
রাস্তা নয় যেন খাল
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের বলেন, টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে ইদানীং পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি, চর্মরোগ এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষ বেশি আসছেন। আমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দিচ্ছি। তবে দুর্গন্ধযুক্ত ও ময়লা পানি এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
যা বলছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নতুন কয়েকটি প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে দ্রুত নগরায়ণ, অতিবৃষ্টি এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন খালগুলো দখল ও দূষণে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছি।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় জাগো নিউজকে বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৭ শতাধিক ফ্যাক্টরি রয়েছে। এখানে কিছু ফ্যাক্টরি ও বাসা বাড়ি একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এ কারণে অনেকাংশে খাল এবং ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে একই সঙ্গে দুইটি মাস্টার প্ল্যান এগোচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
কেএইচকে/জেআইএম








