বিশ্বকাপ জয়ের পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্পেন। ফুটবলের মাঠে অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য পরিচিত দেশটি শুধু খেলাধুলাতেই নয়, বরং সংস্কৃতি, জীবনযাপন এবং দৈনন্দিন অভ্যাসেও বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে আলাদা।

প্রথমবার স্পেনে ঘুরতে যাওয়া অনেক পর্যটকই একটি বিষয় দেখে অবাক হন দুপুর হলেই হঠাৎ করে অনেক দোকান, রেস্তোরাঁ, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কিছু অফিসও বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, যেন পুরো শহর কয়েক ঘণ্টার জন্য থেমে গেছে। আসলে এটি কোনো ধর্মঘট বা বিশেষ ছুটি নয়। এর নাম ‘সিয়েস্তা’ স্পেনের বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী মধ্যাহ্ন বিরতির সংস্কৃতি।

jagonewsঐতিহ্যগতভাবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনেক ছোট দোকান ও পারিবারিক ব্যবসা বন্ধ থাকে

সিয়েস্তা কী?

‘সিয়েস্তা’ বলতে সাধারণত দুপুরের খাবারের পর কয়েক ঘণ্টার বিশ্রামকে বোঝায়। ঐতিহ্যগতভাবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনেক ছোট দোকান ও পারিবারিক ব্যবসা বন্ধ থাকে। এ সময় কর্মীরা বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবার খান, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান বা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এরপর সন্ধ্যার দিকে দোকান আবার খুলে রাত পর্যন্ত ব্যবসা চলে।

এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও আবহাওয়ার প্রভাব। স্পেনের অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে দুপুরে প্রচণ্ড গরম পড়ে। অতীতে যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না, তখন তীব্র গরম এড়িয়ে কাজের সময় ভাগ করে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সেই ঐতিহ্যই ধীরে ধীরে সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খাইয়েছিল আর্জেন্টিনা!

সিয়েস্তার ঐতিহ্য ও বর্তমান

অনেকের ধারণা, স্পেনের সব শহরে দুপুর হলেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এখন আর আগের মতো নেই। মাদ্রিদ, বার্সেলোনার মতো বড় শহর, শপিং মল, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দোকান এবং বড় সুপারমার্কেট সাধারণত সারাদিনই খোলা থাকে। তবে ছোট শহর, গ্রামাঞ্চল এবং পারিবারিক মালিকানাধীন দোকানগুলোতে এখনো সিয়েস্তার প্রচলন রয়েছে। তাই পর্যটকদের অনেক সময় দুপুরে প্রয়োজনীয় দোকান বন্ধ পেয়ে অপেক্ষা করতে হয়।

jagonewsএ সময় কর্মীরা বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবার খান, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান বা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন

স্পেনের মানুষ রাতের খাবার খান দেরিতে

স্পেনের আরেকটি অদ্ভুত অভ্যাস হলো রাতের খাবার খাওয়ার সময়। বিশ্বের অনেক দেশে যখন রাত ৭টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ হয়ে যায়, সেখানে স্পেনে অনেক পরিবার রাত ৯টা থেকে ১০টার দিকে খাওয়া শুরু করে। গ্রীষ্মে কখনো কখনো রাত ১১টাও হয়ে যায়। এর একটি কারণ হলো সিয়েস্তা এবং দীর্ঘ কর্মদিবস। দুপুরে দীর্ঘ বিরতির কারণে কাজ শেষ হতেও দেরি হয়। ফলে রাতের খাবারের সময়ও পিছিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

শুক্রবার দিন ১৩ তারিখ হলে কেন ফ্রান্সের মানুষ আতঙ্কে থাকেন

নতুন বছরে ১২টি আঙুর খাওয়ার রীতি

স্পেনে নতুন বছর উদযাপনের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্য হলো মধ্যরাতে ঘড়ির ১২টি ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে ১২টি আঙুর খাওয়া। বিশ্বাস করা হয়, প্রতিটি আঙুর আগামী ১২ মাসের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে। সময়মতো ১২টি আঙুর খেতে পারলে বছরটি শুভ যাবে এমন বিশ্বাস এখনো দেশজুড়ে জনপ্রিয়।

jagoস্পেনে নতুন বছর উদযাপনের জনপ্রিয় ঐতিহ্য হলো মধ্যরাতে ১২টি আঙুর খাওয়া

টমেটো যুদ্ধের উৎসব

স্পেনের সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবগুলোর একটি লা টোমাটিনা। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ একে অপরের দিকে পাকা টমেটো ছুড়ে আনন্দ করেন। এক ঘণ্টার এই উৎসবে শত শত টন টমেটো ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা শুধু এই উৎসবে অংশ নিতেই স্পেনে যান।

আরও পড়ুন

আর্জেন্টাইনরা কেন এত কুসংস্কার মানেন? ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা যা করেন

ষাঁড়ের সঙ্গে দৌড়

স্পেনের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন রানিং অব দ্য বুলস। এতে অংশগ্রহণকারীরা শহরের রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া ষাঁড়ের সামনে দৌড়ান। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও শতাব্দীপ্রাচীন এই আয়োজন এখনো দেশটির সংস্কৃতির অংশ। তবে প্রাণীকল্যাণ নিয়ে বিতর্কের কারণে এ আয়োজন নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।

jagoস্পেনের সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবগুলোর একটি লা টোমাটিনা

পরিবারকে সময় দেওয়ার সংস্কৃতি

স্পেনে পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। সপ্তাহান্তে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাবার খাওয়া, আড্ডা দেওয়া কিংবা বাইরে ঘুরতে যাওয়াকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করেন। ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যেও পারিবারিক সম্পর্ক ধরে রাখার এই সংস্কৃতি স্প্যানিশ সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত।

ফুটবল স্পেনের সংস্কৃতির অংশ

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি জাতীয় পরিচয়েরও অংশ। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ফুটবল শেখানো হয়। স্থানীয় ক্লাবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্কুল পর্যায়ের প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় তৈরির পরিকল্পনার কারণে দেশটি নিয়মিতই বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করতে সক্ষম হয়।

jagoস্পেনে অনেক পরিবার রাত ৯টা থেকে ১০টার দিকে খাওয়া শুরু করে

ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধন

স্পেন এমন একটি দেশ, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য পাশাপাশি টিকে আছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উচ্চগতির রেলব্যবস্থায় দেশটি ইউরোপের অগ্রগামী রাষ্ট্রগুলোর একটি, অন্যদিকে সিয়েস্তা, লা টোমাটিনা কিংবা নতুন বছরে ১২টি আঙুর খাওয়ার মতো সংস্কৃতিও এখনো সমান জনপ্রিয়।

বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনের ফুটবল নিয়ে আলোচনা যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশটির জীবনযাপন ও সংস্কৃতি নিয়েও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তাই স্পেনে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো দুপুরে হঠাৎ দোকান বন্ধ দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেটি হয়তো কোনো সমস্যা নয়, বরং শত বছরের পুরোনো একটি সংস্কৃতিরই অংশ।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা ও মেসি

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, স্পেন গাইড

কেএসকে