এক যুগ আগে ব্রাজিলের মারাকানায় চোখের জল নিয়ে ফিরেছিলেন তিনি। আট বছর পর কাতারের লুসাইলে সেই চোখেই ধরা দিয়েছিল পরিপূর্ণতার আনন্দ। দুটি বিশ্বকাপ, দুটি ভিন্ন অনুভূতি—কিন্তু এক জায়গায় মিল ছিল। দুই আসরেই লিওনেল মেসির হাতে উঠেছিল টুর্নামেন্টসেরার গোল্ডেন বল। কোনো ফুটবলারই তা পাননি এর আগে।

এখন ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক দাঁড়িয়ে আরেকটি ইতিহাসের দুয়ারে। আর একবার যদি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান, তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনবার গোল্ডেন বল জেতা প্রথম খেলোয়াড় হবেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপে তাঁর প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি গোল, প্রতিটি পাস যেন সেই ইতিহাসের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

গোল্ডেন বলের দৌড়ে মেসি যে সবচেয়ে এগিয়ে, সেটি শুধু আলোচনাতেই নয়, প্রতিফলন ঘটেছে বাজির বাজারেও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রেডিকশন মার্কেট ও স্পোর্টসবুক তাঁকেই সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখছে। এর পেছনে কারণও স্পষ্ট। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মেসি। গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে দলকে পথও দেখিয়েছেন।

ফাইনালের আগে তাঁর নামের পাশে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনার ১২টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। তবে মেসির প্রভাব শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নকআউট পর্বে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তিনিই পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুটি গোলই এসেছে তাঁর অ্যাসিস্ট থেকে। গোল না করেও কীভাবে একটি ম্যাচের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হওয়া যায়, সেটির উদাহরণও রেখেছেন তিনি।

গোল্ডেন বলের মূল্যায়নে এ ধরনের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু গোলসংখ্যা নয়, একজন ফুটবলার পুরো টুর্নামেন্টে কতটা ধারাবাহিক ছিলেন, কঠিন মুহূর্তে দলের জন্য কী করেছেন এবং ম্যাচের ফল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা কতটা ছিল—সবই বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের তালিকা তৈরি করে, পরে স্বীকৃত সাংবাদিকদের ভোটে নির্ধারিত হয় বিজয়ী।

প্রেডিকশন মার্কেট কালশিতে মেসির গোল্ডেন বল জয়ের সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে ৯০ শতাংশ। ফ্যানডুয়েল স্পোর্টসবুকে তাঁর অডস -১০০০, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এবারের বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মেসিকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।

মেসির সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের মিডফিল্ডার রদ্রি। স্পেনকে ফাইনালে তুলতে মাঝমাঠে অসাধারণ ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্ব দেখিয়েছেন তিনি। অনেকে তাঁর এবারের পারফরম্যান্সের সঙ্গে ২০১৮ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বলজয়ী লুকা মদরিচের অভিযানের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তবে বাজির বাজারে রদ্রির অডস +৬০০। স্পেনের মাঝমাঠে তাঁর নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্ব ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দলকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেকে তাঁর এবারের বিশ্বকাপকে ২০১৮ সালে লুকা মদরিচের অভিযানের সঙ্গে তুলনা করছেন। লামিনে ইয়ামাল, মিকেল ওইয়ারসাবাল, জুড বেলিংহাম ও কিলিয়ান এমবাপ্পেও আলোচনায় আছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রভাব, গোলে অবদান এবং ধারাবাহিকতার বিচারে মেসিই এগিয়ে।

গোল্ডেন বলের ইতিহাসও বলছে, এই পুরস্কার জিততে বিশ্বকাপ জেতা বাধ্যতামূলক নয়। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনা ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে গেলেও টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন মেসি। চার বছর পর ২০১৮ সালে রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদরিচও একই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রভাব রাখা ফুটবলারই এই পুরস্কারের দাবিদার। এবারের বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিলে সেই ইতিহাসের খুব কাছেই আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।