চলতি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙেছে ফ্রান্সের। বাংলাদেশ সময় শনিবার দিবাগত রাত ৩টায় মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মাঠে নামবে ফ্রান্স। বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভাঙলেও তারকায় ঠাসা ফ্রান্স দলের ফুটবলারদের মধ্যকার বৈচিত্র্য ও শক্তিমত্তা অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগায়। এ যেন কোনামির ইফুটবল বা ইএ স্পোর্টসের ফিফার মতো কোনো গেমের ফুটবল একাদশ।
ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। বিশ্বব্যাপী নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রটির অগ্রাধিকার থাকে। এ জন্যেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের একটি ফ্রান্স। দেশটির এই আধিপত্য বিস্তারের শুরুটা জ্যাক কার্টিয়ার নামের এক নাবিকের হাত ধরে। তিনি প্রথম ফরাসি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন।
১৬শ শতক থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে উঠতে থাকে ফরাসি উপনিবেশ। সপ্তদশ শতাব্দীতে তারা ভারতে গঠন করেছিলে ‘ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। তবে, সবচেয়ে বেশি ফরাসি উপনিবেশ ছিলো আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়।
এই উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ছাপ দেখা যাচ্ছে ফ্রান্সের বর্তমান ফুটবলে। দেশটির নাম উচ্চারিত হলেই চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে জিদান, এমবাপে, দেম্বেলে কিংবা এন'গোলো কান্তের মতো তারকাদের মুখ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তারা সবাই একই জার্সিতে খেললেও এদের কেউই পারিবারিকভাবে ফ্রান্সের না। সবাই অভিবাসিত ফরাসি নাগরিক।
বর্তমান ফরাসি জাতীয় দলের ফুটবলারদের পারিবারিক শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। কারও বাবা-মা ক্যামেরুন, মালি বা আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন, কারও পরিবারের উৎস হাইতি, বেনিন, কঙ্গো, গুয়াদেলুপ কিংবা মার্তিনিকে।
প্রত্যেকের পারিবারিক ইতিহাস বহন করছে ভিন্ন ভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও অভিবাসনের গল্প। সেই বৈচিত্র্যই আজকের ফরাসি ফুটবলকে করেছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বহুসাংস্কৃতিক দল। চলুন, জেনে নেওয়া যাক ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের স্কোয়াডে থাকা ফুটবলারদের অভিবাসন সংগ্রামের গল্প।

২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ঘোষিত ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে রবিন রিসার, লুকাস ডিগনে, আদ্রিয়েন র্যাবিও এবং মার্কাস থুরাম-শুধু এই চারজন খেলোয়াড়েরই পারিবারিক শেকড় ফ্রান্সে। বাকিদের কারও বাবা, কারও মা আবার কারও বাবা-মা দুজনেই ফ্রান্সের বাইরের অন্য কোনো দেশ থেকে আসা অভিবাসী।
ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁ জন্মগ্রহণ করেছেন ফরাসি গায়ানার কায়েনে। এটি ফ্রান্সের একটি ওভারসিজ ডিপার্টমেন্ট। তবে তার মা হাইতির নাগরিক এবং বাবা ফ্রান্সের আরেক ওভারসিজ অঞ্চল গুয়াদেলুপ থেকে এসেছেন।
আরেক গোলরক্ষক ব্রাইস সাম্বার বাবা-মা দুজনই কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে এসেছেন। তার বাবা ক্রিশ্চিয়ান ব্রাইস সাম্বা কঙ্গো জাতীয় দলের সাবেক গোলরক্ষক ছিলেন। তার ফরাসি ও কঙ্গোলিজ-দ্বৈত নাগরিকত্বও রয়েছে।
রাইট ব্যাক মালো গাস্তোর বাবা পর্তুগিজ ও মার্তিনিকান বংশোদ্ভূত এবং তার মা ফরাসি। তবে তিনি ফ্রান্সের দেসিন-শারপিয়ু শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন।

এদিকে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দুই ভাই থিও হার্নান্দেজ এবং লুকাস হার্নান্দেজের মা ফরাসি এবং তাদের বাবা ফরাসি হলেও স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত। তাদের বাবা-মা দুজনই ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে তাদের বাবার পারিবারিক শিকড় স্পেনে এবং তিনি ফ্রান্স ও স্পেন উভয় দেশেই পেশাদার ফুটবল খেলেছেন।
ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতের বাবা-মা দুজনই মালি থেকে এসেছেন। তার জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে হলেও তিনি মালিয়ান বংশোদ্ভূত।
আরেক ডিফেন্ডার জুলস কুন্দের বাবা-মা দুজনই বেনিন বংশোদ্ভূত। তার বাবা বেনিন প্রজাতন্ত্রের নাগরিক এবং মায়েরও পারিবারিক শিকড় বেনিনে। কুন্দে প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তার রয়েছে ফরাসি ও বেনিনিজ—দ্বৈত নাগরিকত্ব।
ম্যাক্সেন্সে লাক্রোইক্সের বাবা ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থিত ফ্রান্সের ওভারসিজ ডিপার্টমেন্ট গুয়াদেলুপ থেকে এসেছেন এবং মা মাদাগাস্কার থেকে। তবে বাবা-মা দুজনই ফরাসি নাগরিক।
দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উইলিয়াম সালিবার বাবা ছিলেন লেবাননের নাগরিক এবং তার মা ক্যামেরুনের নাগরিক। তবে, আর্সেনাল ও ফ্রান্স জাতীয় দলের এই ডিফেন্ডার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে।
মূল একাদশের আরেক ডিফেন্ডার দায়োত উপামেকানোর বাবা-মা দুজনই গিনি-বিসাউ থেকে এসেছেন। তাদের পারিবারিক শিকড় গিনি-বিসাউয়ের জেটা দ্বীপে। যদিও তার বাবা-মা বিসাউ-গিনিয়ান নাগরিক, উপামেকানো ফ্রান্সের এভরো শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন। ফলে তিনি জাতীয়তায় ফরাসি।
অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার এন'গোলো কান্তের বাবা-মা দুজনই মালির নাগরিক। তারা ১৯৮০ সালে মালি থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে অভিবাসন করেন। সেখানেই কান্তের জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

আরেক মিডফিল্ডার মানু কোনের বাবা-মা দুজনই মূলত আইভরি কোস্ট থেকে এসেছেন। পারিবারিক শিকড়ের কারণে এএস রোমার এই মিডফিল্ডারের রয়েছে ফরাসি ও আইভরিয়ান-দ্বৈত নাগরিকত্ব।
অরেলিয়ান চুয়ামেনির বাবা-মা দুজনই ক্যামেরুন থেকে এসেছেন। যদিও রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের এই মিডফিল্ডারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে, তাঁর পারিবারিক শিকড় সরাসরি মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনে।
পিএসজি তারকা ওয়ারেন জাইরে-এমেরির বাবা ফ্রাঙ্ক এমেরি ফরাসি এবং তাঁর মা মার্তিনিকান বংশোদ্ভূত। এ কারণে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের এই মিডফিল্ডারের রয়েছে ফ্রান্স ও মার্তিনিক-উভয়ের নাগরিকত্ব।
মাগনেস আকলিউশ ফ্রান্সে আলজেরীয় বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। বাবা-মায়ের সূত্রে তার রয়েছে ফরাসি ও আলজেরীয়-দ্বৈত নাগরিকত্ব। তার বাবা-মায়ের বাড়ি আলজেরিয়ার কাবিলি অঞ্চলের বুইরা প্রদেশের রাফুর শহরে।
উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলার জন্ম ফ্রান্সে; কিন্তু তার বাবা টোগোর নাগরিক এবং মা ফরাসি। ব্র্যাডলি ফ্রান্স ও টোগো-উভয় দেশেরই নাগরিকত্ব ধারণ করেন। এছাড়া তার বড় ভাই ম্যালকম বারকোলা একজন আন্তর্জাতিক ফুটবলার যিনি টোগো জাতীয় দলের হয়ে গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন।
রায়ান চেরকির বাবা-মা দুজনই আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। তার মা আবলা সরাসরি আলজেরিয়া থেকে এসেছেন। আর বাবা ফ্যাব্রিস চেরকি আলজেরীয় ও ইতালীয়-উভয় বংশোদ্ভূত।
ফ্রান্সের তারকা ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলের বাবা মালির নাগরিক এবং তার মা মৌরিতানিয়া ও সেনেগালি বংশোদ্ভূত। বাবা-মা দুজনেরই পারিবারিক শিকড় পশ্চিম আফ্রিকায়। পরে তারা ফ্রান্সে অভিবাসন করেন, যেখানে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন ও ফ্রান্স জাতীয় দলের এই তারকা ফুটবলারের জন্ম হয়।

আরেক তারকা দেজিরে দুয়ে ফ্রান্সে একজন আইভরিয়ান বাবার এবং একজন ফরাসি মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মায়ের পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তার রয়েছে ফরাসি ও আইভরিয়ান-দ্বৈত নাগরিকত্ব।
জ্যাঁ-ফিলিপ মাতেতা ফ্রান্সে একজন কঙ্গোলিজ বাবা এবং একজন ফরাসি মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) সাবেক পেশাদার ফুটবলার।
ফ্রান্সের প্রধান তারকা কিলিয়ান এমবাপের বাবা ক্যামেরুন থেকে এবং মা আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। তার বাবা উইলফ্রিড এমবাপে ক্যামেরুনের জেবালে শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে ফ্রান্সে অভিবাসন করেন। তার মা ফাইজা লামারি আলজেরিয়ার কাবিলি অঞ্চলের বংশোদ্ভূত হলেও বেড়ে উঠেছেন ফ্রান্সে।
এদিকে মাইকেল ওলিসের বাবা নাইজেরিয়ান এবং তার মা ফরাসি-আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। বাবা-মায়ের পারিবারিক পরিচয় এবং ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণের কারণে বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স জাতীয় দলের এই ফরোয়ার্ড ফ্রান্স, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া ও ইংল্যান্ড-এই চারটি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।
চলতি বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও ফ্রান্সের বর্তমান দলটি ফুটবল বিশ্বের অন্যতম অনন্য এক উদাহরণ। ভিন্ন ভিন্ন দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির পারিবারিক শিকড় থেকে উঠে আসা এই ফুটবলাররা একই জার্সির নিচে এক হয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করছেন ফ্রান্সকে। একসময়ের উপনিবেশ বিস্তারের ইতিহাস আজ যেন নতুন রূপে প্রতিফলিত হয়েছে দেশটির ফুটবলে, যেখানে বৈচিত্র্যই ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি ও পরিচয়।
আরএএইচইউএল/এমএমআর








