কানসাস সিটিতে ম্যাচের তখন ৭২ মিনিট। পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনেইরো লাল কার্ড দেখানোর পর শিশুর মতো কাঁদছিলেন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো।
লাল কার্ড দেখার সে ঘটনার পাঁচ মিনিট আগে ১–১ গোলে সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এ ব্যবধান থাকলেও অতিরিক্ত সময়ে দুই গোল করে শেষ পর্যন্ত ৩–১ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড মানে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক হচ্ছে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, লিয়ান্দ্রো পারেদেস বুঝি এমবোলোকে ফাউল করেছেন। হলুদ কার্ড দেখেন এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। কিন্তু ভিএআর এরপরই হস্তক্ষেপ করে। বেশ কয়েকটি ভিডিও রিপ্লে খতিয়ে দেখা হয় এবং সেখানে স্পষ্ট ধরা পড়ে, পারেদেস কোনো ফাউল করেননি এমবোলোকে। বরং এমবোলো নিজেই ডাইভ দেন।
এরপর পারেদেসের হলুদ কার্ডটি তুলে নিয়ে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড ও লাল কার্ড দেখানো হয়। বিশ্বকাপে এটাই প্রথম ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্ত’ (মিসটেকেন আইডেন্টিটি) করা ঘটনা নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরন দেখেছিলেন হলুদ কার্ড। তবে এই ঘটনার জন্য মাঠ ছাড়তে হলো প্রথম এমবোলোকেই। সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তাঁরা মাঠেই প্রতিক্রিয়া দেখান।
রেফারি পিনেইরোর লাল কার্ড দেখানোর এই সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করেছে ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন। সেখানে সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস খুঁজে দেখেছেন, কেন এমবোলোকে লাল কার্ড দেখানো হলো।
কী ঘটেছিল
ব্রিল এমবোলোকে ফাউল করার অপরাধে প্রথমে আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন রেফারি। তবে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পর্যালোচনার পর রেফারি পারেদেসের হলুদ কার্ডটি বাতিল করেন এবং ডাইভ দেওয়ার (সিমুলেশন) অপরাধে এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখান। সুইস ফরোয়ার্ড আগেই একটি হলুদ কার্ড দেখেন, ফলে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়।
মূলত ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ (মিসটেকেন আইডেন্টিটি) সংক্রান্ত নতুন নিয়মের কারণেই এমন ঘটেছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্পষ্ট ভুলের অকাট্য প্রমাণ থাকলে ভিএআর রেফারিকে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে সতর্ক করার বা কার্ড দেখানোর সুপারিশ করতে পারে।
মেসির সঙ্গে প্রথম ‘ডেট’ ইংল্যান্ডেরভিএআরের সিদ্ধান্ত
সাধারণ পরিস্থিতিতে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেওয়ার জন্য ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) সুপারিশ করতে পারে না। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনায় রেফারি ভুল করে ভুল দলের খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দিয়েছেন—এমন স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ থাকলে, সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউ (মাঠের স্ক্রিনে গিয়ে পুনরায় দেখার) করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় ভিডিওতে এমবোলোর ডাইভ দেওয়ার প্রমাণ ছিল স্পষ্ট। তাই মাঠের স্ক্রিনে রিপ্লে দেখার পর রেফারিও ভিএআরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হন এবং এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন।

ডেভিসের রায়
এই ঘটনার জন্য এমবোলো শুধু নিজেকেই দোষ দিতে পারেন। কারণ, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখানোর উদ্দেশ্যে রেফারিকে প্রতারিত করার চেষ্টা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচে আলমিরনের সেই কার্ডের পর এই নিয়মের আত্মপক্ষ সমর্থনে ফিফা বলেছিল, এর মাধ্যমে একটি ভুল সিদ্ধান্তকে শুধরে নেওয়া যায়। এখন এই ঘটনার পর ফিফার কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসে কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা। পাশাপাশি রেফারিদের ভবিষ্যৎ ম্যাচগুলোতেও এই একই ব্যাখ্যা মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও দেখার বিষয়। কারণ, এই নিয়ম ভিএআরকে এমন কিছু ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা আগে তাদের এখতিয়ারে ছিল না।
নতুন নিয়মটি কী
চলতি বিশ্বকাপের জন্য ফিফা বেশ কিছু নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা বিশেষভাবে ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ (মিসটেকেন আইডেন্টিটি) সংক্রান্ত এই নিয়ম চালুর অনুরোধ করেছিলেন।
নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো খেলোয়াড়কে ফাউলের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখানো হয়, কিন্তু পরে দেখা যায় ফাউলটি আসলে প্রতিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড় করেছে, তবে রেফারি তাঁর আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারবেন।
পারেদেসকে যদি ওই ফাউলের জন্য প্রাথমিকভাবে হলুদ কার্ড না দেখানো হতো, তবে ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ নিয়মটি প্রয়োগ করা যেত না এবং এমবোলোও সে যাত্রায় টিকে যেতেন।
ফুটবলের আইন প্রণেতা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড’ (আইএফএবি) ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণকে ‘ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া’ ভুল হিসেবে অভিহিত করেছে।
আইএফএবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ হলো এমন একটি পরিস্থিতি, ‘যখন রেফারি কোনো অপরাধের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখান, কিন্তু ভুলবশত দুই দলের ভিন্ন বা ভুল কোনো খেলোয়াড়কে শাস্তি দিয়ে বসেন।’
ভিএআরের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মাঠের রেফারি ভুল খেলোয়াড় শনাক্ত করলে ভিএআর এখন থেকে সেই ভুলটি ধরে তা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) করার সুযোগ পাবে।
সুইজারল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া
সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হলুদ কার্ড দেওয়ার মতো কোনো কারণই ছিল না। এটি ছিল খুবই সাধারণ এক পরিস্থিতি। রেফারির উচিত ছিল খেলা চালিয়ে যেতে দেওয়া।’
নিয়মটির সমালোচনা করে ইয়াকিন আরও বলেন, ‘এমন একটি নিয়মের কারণে আমাদের শাস্তি পেতে হলো যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি এটা বুঝতেই পারছি না। অহেতুক তাদের (ভিএআর) এই হস্তক্ষেপ আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করেছে। এই নিয়মের সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্কই নেই।’
এমবোলো লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। সেই সুযোগে অতিরিক্ত সময়ে দুটি গোল করে ম্যাচটি জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইয়াকিন বলেন, ‘এটি আমাদের পুরো ম্যাচই শেষ করে দিয়েছে। আমাদের এটা মেনে নিতেই হবে, তবে এভাবে হেরে যাওয়াটা ভীষণ কষ্টদায়ক।’
সেমিফাইনালে কে কার মুখোমুখি, খেলা কখন






