সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় আট আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তিনজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বাকি চারজন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। দণ্ড ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় দেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তিনি এজলাসে আসেন। এরপর তিনি এই মামলার রায় পড়া শুরু করেন। বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে অভিযুক্ত সব আসামিকে কারাগার থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রায়ে মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য চার আসামি আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

আলোচিত এই মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয় গত বুধবার। যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ (১৪ জুলাই) রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
ওই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সে হিসাবে ঘটনার প্রায় ছয় বছরের মাথায় আজ রায় ঘোষণা হলো।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে (২০) দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
একই সময়ে পুলিশ ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র ও চাঁদাবাজি আইনে আরেকটি মামলা করে।
ওই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সে হিসাবে ঘটনার প্রায় ছয় বছরের মাথায় আজ রায় ঘোষণা হলো।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনার আলামতের মিল পাওয়া যায়। পরে ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি অপহরণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও এতে সহায়তার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আটজনের নামে একই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০২২ সালের ১১ মে চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের মামলার অভিযোগেও ওই আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। তাঁরা সবাই তৎকালীন ছাত্রলীগ কর্মী এবং নগরের টিলাগড় এলাকাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

মামলা দুটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বছরের মে মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে তরুণী, তাঁর স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের একজন অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া শাহ মো. মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্করকে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অপহরণের ঘটনায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এই তিনজনকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এ অভিযোগে তাঁদের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডেরও রায় দেওয়া হয়েছে। জরিমানার টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রাপ্ত হবেন বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন বিচারক।
এ ছাড়া অভিযুক্ত রবিউল হাসান ওরফে ইসলাম, মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম, মো. আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল এবং মিছবাউল ইসলাম ওরফে রাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ প্রমাণিত না হওয়া বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ভুক্তভোগীর স্বামী মামলা করার আগেই ঘটনাটি জানাজানি হয়। পুলিশ এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল। পরে ভুক্তভোগীর স্বামী এজাহার দিলেও বিচার ও তদন্তে সেই জিডির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়নি। আদালতের মতে, জিডিটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন ছিল।
মামলার অভিযোগকারী অর্থাৎ ভুক্তভোগীর স্বামী সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এজাহারের কিছু বক্তব্য থেকে সরে গেলেও, ধর্ষণের ঘটনায় স্বামীর সম্মতি বা অসম্মতির কোনো আইনগত গুরুত্ব নেই বলে মন্তব্য করেন বিচারক। আদালত রায়ে বলেন, কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনই ধর্ষণ। এমনকি কোনো যৌনকর্মীকেও তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য করা হলে সেটিও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
যা ঘটেছিল ওই রাতে
ঘটনার শুরু সিলেটের ১৩৪ বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নগরের টিলাগড় এলাকায় অবস্থিত এমসি কলেজের ফটকের সামনে থেকে। ফটকটি সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশেই। ফটকের ভেতরে অনেকে বেড়াতে যান। সেদিন ওই দম্পতিও সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
আগে থেকেই অপকর্মে ধর্ষণকাণ্ডে জড়িতরাতরুণীর স্বামীর বরাত দিয়ে পুলিশ সে সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে স্বামী গিয়েছিলেন দোকানে। ফিরে এসে দেখেন, স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করছেন কয়েকজন তরুণ। স্বামী প্রতিবাদ করলে মারধর করে তাঁদের দুজনকে গাড়িসহ জোর করে তুলে নিয়ে যান ওই তরুণেরা। পাশে বালুচর এলাকায় কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে একেবারে শেষ প্রান্তে নেওয়ার পর স্বামীকে একটা স্থানে আটকে রাখেন তাঁরা। তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ঘণ্টাখানেক পর স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে দুর্বৃত্তরা এলাকা ত্যাগ করেন।
ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে ওই তরুণীর স্বামী বিষয়টি পুলিশকে জানান। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাত্রলীগ কর্মী হওয়ায় পুলিশ প্রথমে ছাত্রাবাসের ভেতরে ঢুকতে গড়িমসি করে। এ অবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সহজেই পালিয়ে যান। গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয় দেশজুড়ে। সমালোচনার মুখে দ্রুতই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়।








