ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বিশ্বকাপগুলোর তালিকা করলে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। সেটিই ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। তবে প্রায় পাঁচ দশক পরও সেই সাফল্যের পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে রেখেছে একটি অভিযোগ। আর্জেন্টিনা কি রাজনৈতিক প্রভাব, কিংবা ঘুুষের বিনিময়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর আজও মেলেনি। কারণ অভিযোগের পক্ষে অনেক পরোক্ষ তথ্য ও সাক্ষ্য থাকলেও, সেটিকে সত্য প্রমাণ করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ কখনোই পাওয়া যায়নি। তবু ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক ও গবেষকদের আলোচনায় ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ এখনো অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়।
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ছিল আর্জেন্টিনার
সামরিক শাসনের ছায়ায় বিশ্বকাপ
১৯৭৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জোর্গে রাফায়েল ভিদেলা। তার শাসনামল ছিল দেশটির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার সময়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সেই সময়ে হাজার হাজার মানুষ গুম, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। ইতিহাসে এটি ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে পরিচিত।
ঠিক এই সময়েই ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ছিল আর্জেন্টিনার। গবেষকদের অনেকের মতে, ভিদেলা সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
আরও পড়ুন
বাবা আলাদা, ইয়ামালের ভাই কেইন সম্পর্কে কতটা জানেন
পেরুর বিপক্ষে ৬-০ গোল কি আসলেই সাজানো?
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচ। ফাইনালে উঠতে আর্জেন্টিনাকে পেরুকে অন্তত চার গোলের ব্যবধানে হারাতে হতো। কারণ এর আগে ব্রাজিল নিজেদের ম্যাচ জিতে গোল পার্থক্যে এগিয়ে ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে আর্জেন্টিনা পেরুকে ৬-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে যায়। এই ফলই সন্দেহের জন্ম দেয়। কারণ পুরো টুর্নামেন্টে শক্ত প্রতিরোধ গড়া পেরু হঠাৎ এত বড় ব্যবধানে হারলো কেন এই প্রশ্ন তখন থেকেই উঠতে থাকে।
ইতিহাসবিদ, সাংবাদিকদের আলোচনায় ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ এখনো অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়
ড্রেসিংরুমে প্রেসিডেন্ট!
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন জানা যায়, ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ভিদেলা পেরুর ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারও। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি ছিল শুভেচ্ছা বিনিময়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুমে রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি অস্বাভাবিক এবং তা মানসিক চাপ তৈরির কারণ হতে পারে।
ঘুষের অভিযোগ কোথা থেকে এলো?
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আরও কিছু তথ্য সামনে আসে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বইয়ে দাবি করা হয়, ম্যাচের পর আর্জেন্টিনা পেরুকে প্রায় ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করে, কয়েক কোটি ডলারের ঋণ ও আর্থিক সুবিধা দেয় এবং কিছু রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেয়। এ থেকেই ধারণা তৈরি হয় এসব সুবিধা কি পেরুর বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানের জয়ের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল? তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সরকারি কোনো নথিও ঘুষের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ডের রেকর্ড যে দেশের
কিন্তু খেলোয়াড়দের বক্তব্য যা প্রমাণ করে
পেরুর কয়েকজন সাবেক খেলোয়াড় বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তারা ম্যাচ ছেড়ে দেননি। আবার অন্যদিকে কিছু সাংবাদিক ও গবেষক দাবি করেছেন, রাজনৈতিক চাপের পরিবেশে খেলাটি হয়েছিল। পেরুর গোলরক্ষক রামন কিরোগার জন্ম আর্জেন্টিনায় হওয়ায় তাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বারবার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ম্যাচটি স্রেফ তাদের বাজে দিনের ফল।
ফাইনাল নিয়েও বিতর্ক
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচেও বিতর্ক থামেনি। ডাচ ফুটবলার রেনে ভান দে কেরখফের হাতের প্লাস্টার নিয়ে ম্যাচের আগে আপত্তি তোলে আর্জেন্টিনা। এতে ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয় এবং ডাচ খেলোয়াড়দের মনোযোগ নষ্ট হয়েছিল বলে পরে অভিযোগ ওঠে। ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচ শেষে নেদারল্যান্ডসের অনেক খেলোয়াড় রেফারিং ও আয়োজকদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ফিফাও কখনো ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করে আর্জেন্টিনাকে দোষী ঘোষণা করেনি
গবেষকরা কী বলছেন?
ফুটবল ইতিহাস নিয়ে লেখা বহু বই ও গবেষণাপত্রে ১৯৭৮ বিশ্বকাপের বিতর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ইয়ালপ তার ‘হাও দ্যে স্টল দ্য গেম’ বইয়ে বিশ্বকাপকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। আবার ইতিহাসবিদ ডেভিড গোল্ডব্ল্যাট তার ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে ১৯৭৮ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব বই ও অনুসন্ধান অভিযোগ, সাক্ষ্য ও পরিস্থিতিগত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে; কোনোটিই আর্জেন্টিনা ঘুষ দিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল এমন চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
এমনকি ফিফাও কখনো ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করে আর্জেন্টিনাকে দোষী ঘোষণা করেনি। শিরোপাও বাতিল করা হয়নি। অফিসিয়াল রেকর্ডে আর্জেন্টিনাই ১৯৭৮ সালের বৈধ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
আরও পড়ুন
স্পোর্টসম্যানশিপের যে লড়াইয়ে আমরা হেরে যাচ্ছি
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি
প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা-পেরু ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি। রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না, রাষ্ট্রীয় প্রভাব কতটা কাজ করেছিল কিংবা আর্থিক সুবিধা আদান-প্রদান হয়েছিল কি না এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর আজও মেলেনি।
তাই আর্জেন্টিনা ঘুুষ দিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। তবে এটিও সত্য যে, আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়কে ঘিরে ওঠা গড়াপেটা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধার অভিযোগ আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি। ইতিহাসের পাতায় তাই ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়ের স্মারক, অন্যদিকে তেমনি ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোরও একটি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউওয়ার্ক টাইমস
কেএসকে








