লিওনেল মেসির চোখে জল। ইস্ট রাদারফোর্ডের স্টেডিয়ামে রবিবারের সেই মুহূর্তটি দেখে পুরো বিশ্ব এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়েছিল। হয়তো এটাই বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তির শেষ ম্যাচ ছিল।

একটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ আর টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের অপমৃত্যু, মেসিকে ভাসিয়েছিল বেদনার সাগরে। সব জল্পনা-কল্পনার মধ্যে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও সোমবার সন্ধ্যায় ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন বার্তা দেন মেসি। গলায় রুপালি পদক পরা নিজের একটি ছবি শেয়ার করে তিনি অভিনন্দিত করেন নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে। সঙ্গে লিখে জানান, এই স্মৃতিগুলো সারাজীবন থেকে যাবে।

স্প্যানিশ ভাষায় মেসি লেখেন, ‘কষ্টটা অনেক বড়, আর এই ক্ষত শুকাতে কিছুটা সময় লাগবে।’ তবে শুধু আক্ষেপের কথাতেই থেমে থাকেননি তিনি। যোগ করেন, ‘আমি সব ভালো মুহূর্তগুলোও মনে রাখতে চাই। যেভাবে প্রতিটি ম্যাচে আমরা নিজেদের সেরাটা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই মুহূর্তগুলো সারা জীবন আমাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে। একই সঙ্গে একটি পুরো দেশের সমর্থন আর এই দলের কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা আমাদের আবারও বিশ্বের সেরা দলগুলোর তালিকায় ফিরিয়ে এনেছে।’

বর্তমানটা কঠিন হলেও নিজেদের অর্জনের গুরুত্ব তিনি ভুলে যাননি। মেসি আরও লিখেন, ‘এখনই হয়তো এই অর্জনের সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন, কিন্তু এই দলটি টানা দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে।’ চার বছর আগের গল্পটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে অপূর্ণতা ঘুচিয়েছিলেন মেসি। জিতেছিলেন ক্যারিয়ারের একমাত্র অধরা বিশ্বকাপের ট্রফিটি। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চেও আর্জেন্টিনা ছিল অন্যতম সেরা পরাশক্তি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়েই ফাইনালে উঠেছিল আলবিসেলেস্তারা। কিন্তু ফাইনালে স্প্যানিশ রক্ষণভাগের কঠিন দেয়ালে তারা এমনভাবে আটকে যায় যে পুরো ম্যাচে একটিও শট লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। ফলস্বরূপ, ১-০ গোলের হারে শিরোপা তুলে দিতে হয় স্পেনের হাতে।

চলতি বিশ্বকাপ চলাকালেই ৩৯ বছরে পা দিয়েছেন মেসি। আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৪৩ বছর, যা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয়। সেই বিশ্বকাপে তাকে আবার দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেল।

নিজের বার্তায় দেশের মানুষের কথা স্মরণ করে মেসি লেখেন, ‘সবার শুভেচ্ছা ও বার্তার জন্য হৃদয় থেকে ধন্যবাদ। আবারও আমরা একটি দেশ হিসেবে একতাবদ্ধ হতে পেরেছি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছি। আর এক হয়ে একটি টুর্নামেন্ট জয়ের এই যে বিশাল গর্ব, তা ভাগ করে নিয়েছি।’

শিরোপা হাতছাড়া হলেও ব্যক্তিগত অর্জনে এই টুর্নামেন্ট মেসিকে দিয়ে গেছে নতুন রেকর্ড। টুর্নামেন্টের শুরুতেই মিরোস্লাভ ক্লোসোর ১৬ গোলের অলটাইম রেকর্ড ভেঙে দেন তিনি। পরবর্তীতে নিজের ঝুলিতে মোট ২১টি বিশ্বকাপ গোল জমা করলেও তাকে পেছনে ফেলে ২২ গোল নিয়ে শীর্ষে চলে যান ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। ১০টি গোল করে মেসির ৮ গোল পেছনে ফেলে গোল্ডেন বুটও নিজের নামে করে নেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।

সুদীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এই যাত্রার পর আপাতত বিশ্রাম প্রয়োজন। ধকল সামলে উঠতে মেসির পাশাপাশি তার জাতীয় দল ও ক্লাব সতীর্থ রদ্রিগো দে পলও ইন্টার মায়ামির পরবর্তী দুটি নিয়মিত মৌসুমের ম্যাচ এবং এমএলএস অল-স্টার গেমে খেলবেন না।

সব মিলিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে গেলেও, আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ে যে ভালোবাসার বাঁধন মেসি গড়ে তুলেছেন, তা হয়তো কোনো পরাজয় দিয়েই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।