দেশের অর্থনীতির তুলনায় ২৫ ধাপ পিছিয়ে আছে বিমা খাত। এ খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্রাহকদের আস্থা সংকট। বেশ কয়েকটি কোম্পানি গ্রাহকের বিমা দাবি পূরণ করছে না। এ খাতে গ্রাহকের পাওনা সাত হাজার কোটি টাকা। এছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার কম এবং যুগোপযোগী পণ্য (বিমা প্রডাক্ট) নেই। এ অবস্থার উত্তরণে সুশাসন নিশ্চিত, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিমাবিষয়ক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিমা খাতে সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আইআরএফ সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এমপি, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন। সঞ্চালনা করেন আইআরএফের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘দেশের বিমা খাতে মালিক শক্তিশালী আবার ওই মালিকের কোম্পানি দুর্বল। এ খাতে ন্যায্যতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বড় ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিমাসহ পুরো আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার অতিনিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী নয়। তবে গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’ এ সময়ে বিমা খাতের উন্নয়নে পাঁচটি দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন তিনি। এগুলো হলো-বিমা কোম্পানিতে লুটপাট ও মালিকানার অপসংস্কৃতি বন্ধ করা, কৃষি ও স্বাস্থ্যবিমাসহ নতুন পণ্যের সম্প্রসারণ, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং কার্যকর বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ হলেও কৃষি বিমার প্রসার খুবই সীমিত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমাও সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকসেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিমা খাতে ন্যায্যতা, অধিকার এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ-এই তিন ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে।’
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ‘বিমা খাত সংস্কারে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হিসাবে গড়ে তোলা এবং খাতের সক্ষমতা বাড়ানো।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি রয়েছে। প্রতিটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সব বিকল্প শেষ হওয়ার পর সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কোম্পানির অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে রয়েছে। কোথাও সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।’
নাদিয়া নিভিন বলেন, ‘পুরোনো কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ‘রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন’ চালু করা হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, মাইক্রোইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণ, তাকাফুলের নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা শিক্ষা চালু এবং পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসাবে এ খাতের ভুমিকা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা কোম্পানি-এই তিন পক্ষের আন্তরিকতা ছাড়া কোনো সংস্কার সফল হবে না।’
বিআইএ সভাপতি সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘বিমা কমিশনকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অনিয়ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। একই সঙ্গে মোটরযান বিমা বাধ্যতামূলকভাবে সম্প্রসারণ এবং নতুন খাতে বিমা সেবা চালু করতে হবে।’
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তালমিলিয়ে বিমা খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করতে হবে। এজন্য সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে বিমা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিমার প্রবেশযোগ্যতা এখনো অনেক কম। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রবণতা এ খাতের প্রধান সমস্যা।’
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম নুরুজ্জামান বলেন, ‘জীবন বিমা খাতের সংকট সাধারণ বিমার তুলনায় বেশি। সম্পদ বিক্রির জটিলতা দূর করা এবং ব্যাংক ঋণ সহায়তা সহজ করলে এ সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’
মূল প্রবন্ধে মনির হোসেন বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিমা খাতের আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

