দেশে আরও একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসিয়ে দৈনিক কমপক্ষে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগে হোঁচট খেয়েছে সরকার। জি-টু-জি নীতির আওতায় দ্রুত তৃতীয় এফএসআরইউ বসানোর সব কার্যক্রম গত সপ্তাহে বাতিল করে জ্বালানি বিভাগ। প্রায় ১৮টি দেশ এবং বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ওই প্রকল্পের ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছিল। অনেক দেশ ও কোম্পানি এ ব্যাপারে সাড়াও দেয়। কিন্তু হুট করে সব কার্যক্রম বাতিল হওয়ায় দেশে চলমান গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, জি-টু-জির আওতায় বিভিন্ন দূতাবাস এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে পাঠানো ডকুমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের এক নীতিনির্ধারক। শুধু তাই নয়, ওই নীতিনির্ধারক এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বকাঝকা করেন। এমনকি দেখে নেওয়ারও হুমকি দেন। পরবর্তী সময়ে তার নির্দেশে গত সপ্তাহে ওই এফএসআরইউ বসানোর সব প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্রুত নতুন আরও একটি এফএসআরইউ বসানোর কাজ করছে সরকার। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নতুন একটি এফএসআরইউ বসিয়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো অনেক আগেই দরকার ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, বিএনপি সরকার সবার আগে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে। দেশকে বাঁচাবে। কিন্তু নতুন এফএসআরইউ নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত বদল দেশের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করলে দেশের কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান জীবিত থাকবে না।

দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি চাহিদা থাকলেও সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ১১০ কোটি ঘনফুটের মতো। মহেশখালীতে বসানো দুটি এফএসআরইউ-এর মাধ্যমে এই এলএনজি সরবরাহ দেওয়া হয়। দেশের গ্যাস সংকট কাটাতে তৃতীয় এফএসআরইউ বসালে প্রাথমিকভাবে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর ধরে এ ব্যাপারে ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কেবল সিদ্ধান্তের পরিবর্তন : জি-টু-জির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ বাসানোর জন্য গত মাসে ১২টি কোম্পানির কাছে আরএফপির (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজল) ডকুমেন্ট এবং ঢাকায় মার্কিন ও চীনসহ বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি দিয়েছিল জ্বালানি বিভাগ। ওই ১২টি কোম্পানি হচ্ছে-ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড, সৌদি আরবের আরামকো, আজারবাইজানের সকার ট্রেডিং, যুক্তরাষ্ট্রের গানবোর ইউএসএ, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি, আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর, ইউএই এর আইআরএইচ গ্লোবাল, চীনের সিএমসি, চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, কাজাগ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট, ইউএইএ-এর গ্রুপ অব কোম্পানিজ অব শেখ আহমেদ ফায়সাল আল কাশেমী এবং বিজি ইনার এক্স লিমিটেড।

জানা যায়, এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রকে পাঠানো ডকুমেন্ট নিয়ে তারা বেশ ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এফএসআরইউ বসানোর ব্যাপারে পাঠানো ডকুমেন্টের কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাও করেছে। এর মধ্যে হুট করে সব প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন নতুন এফএসআরইউ বসানোর ডকুমেন্টে আরও কিছু শর্ত বা তথ্য সংযোজন করা হচ্ছে। যাতে নতুন নতুন কোম্পানি এখানে এসে বিনিয়োগ করতে পারে।

সৌদি আরামকোর প্রস্তাব বাতিল : জি-টু-জির আওতায় সৌদি আরবের শীর্ষ কোম্পানি আরমাকো মহেশখালীতে নতুন একটি এফএসআরইউ বসানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী সরকার গত জানুয়ারির শেষ আরামকোকে এ নিয়ে চুক্তি করতে বললে তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা নতুন সরকারের সঙ্গে এফএসআরইউ নিয়ে চুক্তি করতে আগ্রহী। এ ব্যাপারে সমঝোতা এবং অন্যান্য বিষয় দেখতে বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, আরামকো এফএসআরইউতে বিনিয়োগের (প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার) জন্য কঠিন শর্ত দিচ্ছে। এমনকি তারা সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করতে চাইছে না। যেমন: ১৮ মাসে এফএসআরইউ বসাতে আরামকো প্রাথমিকভাবে রাজী হলেও বিএনপি সরকারের আমলে তারা সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। তারা জানিয়েছে, ১৮ মাস নয়, এফএসআরইউ বসাতে ৩০ মাস সময় লাগবে। দ্বিতীয়ত ২ কোটি ডলার পারফরাম্যান্স গ্যারান্টি দিতে তারা রাজি নয়। সর্বোচ্চ দেওয়া হবে ১০ লাখ ডলার, যা সরকারি ক্রয়নীতির পরিপন্থি। তাই আরামকোর সঙ্গে সমঝোতা বাতিল করে নতুন করে জি-টু-জির মাধ্যমে অন্য কোম্পানিকে নির্বাচিত করার সুপারিশ করা হয়।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তৃতীয় এফএসআরইউ বসাতে সামিট গ্রুপকে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু বিতর্কিত ব্যবসায়িক গ্রুপ সামিটের নতুন এফএসআরইউ বসানোর চুক্তি বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ ব্যাপারে সামিট গ্রুপ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে, যা এখন আদালতে বিচারাধীন। অভিযোগ আছে, সামিট গ্রুপ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছে। এখন যে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে, এর একটি সামিট গ্রুপের, আরেকটি এক্সিলারেটের। শেখ হাসিনার আমলে সবচেয়ে সুবিধাভোগী সামিট গ্রুপ অনেক আগেই দেশের বেশির ভাগ সম্পদের শেয়ার সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে।

সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি : দেশে এখন দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। এর মধ্যে স্থানীয় ফিল্ড থেকে উৎপাদন হয় মাত্র ১৫০ কোটি। আগামী বছর এই উৎপাদন ১৪০ থেকে ১৪৪ কোটি ঘনফুটে নামবে। গ্যাসের অভাবে দেশের শত শত শিল্পকারাখানা অর্ধেক ও উৎপাদন করতে পারছে না। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ডিমান্ড নোটের টাকা (সংযোগ ফি) জমা দিয়ে ৫-৬ বছর বসে আছে ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া নতুন শিল্পকারখানার জন্য আবেদন আছে ১ হাজার ৮০০টির মতো। গ্যাসের অভাবে দেশে শিল্পায়ন আটকে আছে কয়েক বছর ধরে। আপাতত এর সমাধান হচ্ছে তৃতীয় এফএসআরইউ বসানো।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, এখন মহেশখালী-আনোয়ারা পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দেয়া যায়। নতুন এফএসআরইউ এলে এই সক্ষমতা হবে ১৭০ কোটি ঘনফুট। তবে সমস্যা হচ্ছে আনোয়ারা-সীতাকুণ্ডু এবং সীতাকুণ্ডু-বাখরাবাদ গ্যাস লাইনের সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে আনোয়ারা-সীতাকুণ্ডু পাইপলাইন করতে নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপ বসানো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই এই পাইপ বসানোর আগে চট্টগ্রামের কাফকো, সিইউএফএল এবং ইউনাটেড পাওয়ারের ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গ্যাস দিতে পারত। এতে ঢাকার সরবরাহ বাড়ানো যেত। নতুন এফএসআরইউ বসানো হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আনোয়ারা-সীতাকুণ্ড এবং ফেনী-বাখরাবাদ ৪২ ইঞ্চি গ্যাস লাইন বাসানো জরুরি। এর মধ্যে ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাখরাবাদ-ফেনী গ্যাস বসানোর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।