বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই হজের খরচ কমানোর ঘোষণা দেয়। তবে, বাংলাদেশিদের জন্য হজ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও সৌদি আরব- এ দুই দেশ সম্পৃক্ত। হজ ব্যবস্থাপনায় বেশিভাগ খরচই হয়ে থাকে সৌদি আরব প্রান্তে। বাংলাদেশ অংশে বড় খরচ হলো উড়োজাহাজ ভাড়া। তাই সেখানেই জোর দিচ্ছে সরকার। উড়োজাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রে খরচ কমছে এটি নিশ্চিত।
তবে, উড়োজাহাজ ভাড়া কমানো হলেও এবার বাংলাদেশ থেকে হজ পালনে খরচ খুব একটা কমছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে রয়েছে, হজ প্যাকেজে খাবার খরচ যুক্ত হওয়া, সৌদি প্রান্তের বিভিন্ন সেবার খরচ বেড়ে যাওয়া ও রিয়ালের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনে দুটি প্যাকেজ করা হচ্ছে। চলতি বছরের ব্যয়বহুল প্যাকেজ-১ বাদ যাচ্ছে। সরকারি প্যাকেজের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ এজেন্সিগুলোও প্যাকেজ ঘোষণা করবে।
আরও পড়ুন
হজের নিবন্ধনের সময় আরও এগিয়ে আনলো সৌদি, কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
সৌদি আরবের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের হজের জন্য হজযাত্রীদের নিবন্ধনসহ অন্যান্য কার্যক্রম এগিয়ে আনা হয়েছে। তাই প্যাকেজ ঘোষণার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। উড়োজাহাজ ভাড়া চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনো আগামী বছরের হজ প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেনি তারা। যদিও হজ প্যাকেজ ঘোষণা দিতে গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দফা সময় ঘোষণা করেও পরে তা স্থগিত করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। আগামী রোববার বা সোমবার (১৯ বা ২০ জুলাই) প্যাকেজ ঘোষণা হতে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া যতটা কমানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট নয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় ভাড়া কমানোর বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করছে বিমান। তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত প্রস্তাব পেলেই ধর্ম মন্ত্রণালয় প্যাকেজ ঘোষণা করবে।
বিমান ভাড়াটা এখনো ফাইনাল হয়নি। এ কারণে হজ প্যাকেজ দিতে পারছি না। আশা করি রোববারের মধ্যেই হয়ে যাবে। না হলে আমাদেরই অসুবিধা হবে। দেরি হলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ বেড়ে যাবে এবং প্রস্তুতির জন্য সময় কমে যাবে।— ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছরের ১৫ মে সৌদি আরবে হজ অনুষ্ঠিত হবে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হিজরি ১৪৪৮/২০২৭ খ্রিষ্টাব্দের হজ উপলক্ষে বিস্তারিত সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। গত ৭ জুন জারি করা রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অংশীজনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হজযাত্রী নিবন্ধন সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে এ রোডম্যাপে।
আরও পড়ুন
হজ প্যাকেজ ঘোষণা নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে হচ্ছে কী?
চলতি বছর হজযাত্রীদের উড়োজাহাজ ভাড়া ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা অর্ধেক করে হজযাত্রী পরিবহন করে থাকেন।
এবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ–১ এর মাধ্যমে হজ পালনে খরচ ধরা হয় ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা। এছাড়া হজ প্যাকেজ-২ এ ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা ও হজ প্যাকেজ-৩ এ ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা খরচ ধরা হয়।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের জন্য খাওয়া ও কোরবানিসহ বিশেষ হজ প্যাকেজে খরচ ধরা হয় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সাধারণ প্যাকেজের মাধ্যমে হজ পালনে ব্যয় হয় মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজের খরচ ধরা হয় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হজযাত্রীদের উড়োজাহাজ ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বিমানের পক্ষ থেকে এবার ভাড়া কমিয়ে এক লাখ ৪২ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আরও বিচার-বিশ্লেষণের অনুরোধ জানায় ধর্ম মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন
যেভাবে হজে যাবেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উড়োজাহাজ ভাড়া চলতি বছরের চেয়ে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা কমছে। বিমানও চায় হজযাত্রীদের স্বস্তি দিতে ভাড়া যতটা সম্ভব কমানো যায়। সর্বোচ্চ পরিমাণ কমানোর জন্য বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।
এরমধ্যে জনপ্রতি ৯৮ হাজার টাকায় হজযাত্রী পরিবহনের প্রস্তাব দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। সরকারের অনুমোদন পেলে ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের পরিবহন করতে চায় তারা। গত মঙ্গলবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাব জানিয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয় ইতিবাচকভাবে এ প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ আগামী বছর থেকে কমপ্রিহেনসিভ প্যাকেজের (সবকিছু সমন্বয় করে) মাধ্যমে সেবা দেবে। আগামী হজে সৌদি আরব সাশ্রয়ী ডি-ক্যাটাগরির সেবা প্রদান বন্ধ করে দিচ্ছে। এ, বি, সি- এই তিন ক্যাটাগরিতে সুবিধা পাওয়া যাবে। এছাড়া নতুন নিয়মের কারণে বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়বে। গত বছর এক রিয়াল ছিল ৩২ টাকা ৮৫ পয়সা। এখনই তা ৩৩ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
আগামী হজে বাধ্যতামূলকভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্যাটারিং সার্ভিস নিতে হবে। এতদিন সরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীরা নিজের মতো করে খাওয়া-দাওয়া করতেন। এখন হজ প্যাকেজে ৪০ হাজার টাকার মতো খাওয়া খরচ বাবদ যুক্ত হবে বলেও জানিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন
আগস্টে ঘোষণা হতে পারে হজ প্যাকেজ, খরচ কমাতে চায় সরকার
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমান ভাড়াটা এখনো ফাইনাল হয়নি। এ কারণে হজ প্যাকেজ দিতে পারছি না। আশা করি রোববারের মধ্যেই হয়ে যাবে। না হলে আমাদেরই অসুবিধা হবে। দেরি হলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ বেড়ে যাবে এবং প্রস্তুতির জন্য সময় কমে যাবে।’
হজ প্যাকেজের সংখ্যা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত দুটি প্যাকেজ রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরবর্তীতে দেওয়া হবে।
আগামী বছরের হজের খরচ কমানোর সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ব্যয় কমিয়ে আনতে। তবে মোট খরচের বড় অংশই সৌদি আরবের নির্ধারিত বিভিন্ন সেবার ওপর নির্ভরশীল।
আমরা চাই হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হোক। এতদিন হজযাত্রীদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। তবে, সৌদি প্রান্তের বেশিরভাগ খরচই বাড়ছে। সবকিছু সমন্বয় করেই সরকার একটি গ্রহণযোগ্য প্যাকেজ ঘোষণা করবে এটাই প্রত্যাশা করি।— হাব মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার
তিনি বলেন, ‘পাঁচ টাকা খরচ হলে চার টাকা যায় সৌদি আরবের হাতে, এক টাকা আমাদের। সৌদি কর্তৃপক্ষ এবার বিভিন্ন খাতে খরচ বাড়িয়েছে। আগে ১০০ জন যাত্রীর জন্য ১ শতাংশ অতিরিক্ত হোটেল বা ব্যাকআপ অ্যাকোমডেশনের ব্যবস্থা রাখতে হতো। এবার তা ২ শতাংশ করতে বলা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত আবাসন ভাড়া নিতে হচ্ছে, যার ব্যয় শেষ পর্যন্ত হজযাত্রীদের ওপরই পড়বে।’
সচিব আরও বলেন, আগে খাবার ব্যবস্থাপনা স্বাধীনভাবে করা গেলেও এবার সেই দায়িত্ব সৌদি সরকার নিজেদের আওতায় নিয়েছে এবং এর জন্য নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ফলে এ খাতেও ব্যয় বাড়বে।
আরও পড়ুন
হজ কত প্রকার, কোনটি উত্তম?
সৌদি রিয়ালের বিনিময় হার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিয়ালের দাম বাড়া মানে আমাদের টাকার মূল্য কমে যাওয়া। পার্থক্য খুব বেশি না হলেও সামান্য পরিবর্তনও বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে। ২০ পয়সার ব্যবধানেও কয়েক হাজার টাকা খরচ বেড়ে যেতে পারে। তারপরও আমরা খরচ কমানোর চেষ্টা করছি।’
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, আমরা চাই হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হোক। এতদিন হজযাত্রীদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।
তিনি বলেন, সৌদি প্রান্তের বেশিরভাগ খরচই বাড়ছে। সবকিছু সমন্বয় করেই সরকার একটি গ্রহণযোগ্য প্যাকেজ ঘোষণা করবে এটাই প্রত্যাশা করি। সরকার হজ প্যাকেজ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের জন্যও প্যাকেজ ঘোষণা করবো।
বাংলাদেশ এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ হজযাত্রীর কোটা পেয়ে থাকে। বেশির ভাগ হজযাত্রী বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হজ পালন করে থাকেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮৭ হাজারের বেশি হজযাত্রী হজ পালন করেন। তবে সময়সূচি এগিয়ে আনা এবং নানান কারণে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৭৮ হাজার ৫০০ জনে। চলতি বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করেছেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন।
আরএমএম/কেএসআর








