যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর আবারো ‘অবরোধ’ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায়, মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ভোররাতে মার্কিন বাহিনী ইরানের আবারো বিমান হামলা চালিয়েছে। 

এর পাশাপাশি ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচালকারী জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র টোল আদায় করবে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে নৌচলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শত বছরের পুরোনো নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

মঙ্গলবার ভোররাতে মার্কিন হামলা জবাবে ইরান বাহরাইন ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এতে একজন নাবিক নিহত ও আটজন আহত হোন। এই হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে, যা আবুধাবি ও দুবাইয়ের মতো শহর সমৃদ্ধ এই দেশটিকে আবারো তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। খবর এপির।

এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। মঙ্গলবার ভোরের দিকে বিশ্ববাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৪ ডলারের উপরে পৌঁছায়। তবে এটি যুদ্ধের চরম পর্যায়ের প্রায় ১২০ ডলারের চেয়ে বেশ কম হলেও, বিশ্বজুড়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান

মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের আবু মুসা, বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, জাস্ক এবং কোনারাক অঞ্চলের আশেপাশে ইরানের ‘উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং নৌ সক্ষমতা’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইরান ওইসব এলাকায় হামলার কথা স্বীকার করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়নি।

মার্কিন সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই হামলাগুলো ইরানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বয়ে আনবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরীহ বেসামরিক নাগরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে।”

মার্কিন বাহিনী নতুন এই হামলার কথা ঘোষণা করার পরপরই হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিস থেকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “এটি আরেকটি বড় ধরনের আক্রমণ।”

তিনি আরো বলেন, “আমরা তাদের খুব শক্তভাবে আঘাত করছি। এটা চলতেই থাকবে এবং দেখা যাক কী হয়। আমরা তাদের সব ধরনের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছি এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নিচ্ছি। আমরা আবারো অবরোধ ফিরিয়ে আনছি।”

এর আগে ট্রাম্প ফি বা টোল আদায় না করার আভাস দিলেও, এবার তার প্রশাসন অবস্থান পরিবর্তন করে হরমুজ প্রণালি পারাপার হওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল নেওয়ার নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, “আমরা বিশ্বের একটি অত্যন্ত ধনী অঞ্চলকে রক্ষা করছি। এজন্য আমাদের অর্থ খরচ হচ্ছে। তাই, আমরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা হলো- এই সুরক্ষার জন্য আমাদেরকে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।”

এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালানোর আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ছিল- কোনো ধরনের টোল ছাড়াই এই প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

বারবারি যুদ্ধ এবং ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় থেকেই মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করে আসছে।

এপির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান- যে পক্ষই ফি আদায়ের চেষ্টা করুক না কেন, তা নৌচলাচলের স্বাধীনতার বৈশ্বিক নিয়মকে লঙ্ঘন করবে ও উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। ফলে এই অঞ্চলের বাইরেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আবারো হামলা শুরু

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার ভোরে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান দুটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে একজন নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন।

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরো জানায়, ইরান ‘মম্বাসা’ এবং ‘আল বাহিয়া’ নামের দুটি ট্যাংকার লক্ষ্য করে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই হামলায় দুটি ট্যাংকারেই আগুন ধরে যায়, তবে পরবর্তীতে আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়।

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই ট্যাংকার হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, জাহাজগুলো ‘বারবার দেওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল’।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, “তারা জেনেশুনে একটি মাইনফিল্ডের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে অচল করে দেওয়া হয়।”

মঙ্গলবারের মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আঘাত হানলে বাহরাইনও নতুন করে হামলার শিকার হয়। বাহরাইনে দুবার ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন বাজানো হয় এবং জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। তবে এই হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্যাংকারে হামলায় নিহত ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুজন ইউক্রেনের নাগরিক রয়েছেন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরো যোগ করেছে, “এই উস্কানির জবাব দেওয়ার এবং নিজের ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রয়েছে।”

যুদ্ধের সময় ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর আগেও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিল। মঙ্গলবার সকালে দুবাইয়ের আকাশে যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শোনা যায়।

আবুধাবিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এবং দুবাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেট মঙ্গলবার ভোরে আমেরিকান নাগরিকদের সতর্ক করে জানিয়েছে যে, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে’ বুধবার পর্যন্ত সব কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়েছে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেত্রা-র মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা চারটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে। জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটি তেহরানের হামলার শিকার হয়েছে।

ইরান পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে: ট্রাম্প

এর আগে সোমবার (১৩ জুলাই), মার্কিন রক্ষণশীল রেডিও হোস্ট হিউ হিউইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, গত মাসে যে চুক্তিটি হয়েছিল তা মূলত ইরানকে ‘পরীক্ষা করার জন্য তৈরি’ করা হয়েছিল। তিনি আরো যোগ করেন, “আপনি যখন কোনো নীতিহীনের সঙ্গে লেনদেন করছেন, তখন চুক্তির কোনো মূল্য থাকে না।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।”

ইরানের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করার ও প্রয়োজনে ফি আদায় করার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ওমানের উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে এমন একটি রুট তৈরির চেষ্টা করছে যা ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে। কিন্তু ইরান সেই রুট ব্যবহার করা জাহাজগুলোর ওপরও হামলা চালিয়ে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে, যা আবার মার্কিন-বান্ধব আরব দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ফলে অন্তর্বর্তীকালীন এই শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো সংশয় তৈরি হয়েছে। চুক্তিটির অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে জারি করা অবরোধ তুলে নিয়েছিল, যে চুক্তিতে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, “আমরা ইরানের ওপর আবারো কঠোর অবরোধ আরোপ করছি। তবে অন্যান্য সব দেশ হরমুজ প্রণালিটি নিয়মমাফিক ও উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারবে।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, “নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সব খরচ মেটানোর জন্য কার্গোর মোট মূল্যের ২০ শতাংশ অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ক্ষতিপূরণ বা ফি’ হিসেবে দিতে হবে।”

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার (১৫ জুলাই) মধ্যরাত থেকে তারা ইরানি বন্দরগুলোতে পুনরায় অবরোধ শুরু করবে।