এমকে হক, জার্মানি
কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে থাকা আমার এক ছোট ভাই আমাকে মেসেজ করেছিল। খুব ছোট একটা প্রশ্ন, ‘ভাই, জার্মানিতে গেলে কি সত্যিই জীবনটা বদলে যায়?’ প্রশ্নটা যতখানি ছোট, এর উত্তরটা ঠিক ততটাই জটিল।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের ধারণা- জার্মানিতে পা রাখলেই বুঝি জীবন রাতারাতি বদলে যায়। ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন, চমৎকার রাস্তাঘাট, পরিচ্ছন্ন শহর, নিয়মতান্ত্রিকতা আর একটা নিরাপদ জীব - এগুলো অবশ্যই সত্যি। কিন্তু এই ধ্রুব সত্যের আড়ালে এমন কিছু রূঢ় বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে, যা সাধারণত কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে ছবিতে প্রকাশ করে না।
আজ আমি কোনো চাকরি, অর্থ বা ইউরো উপার্জনের গল্প বলতে আসিনি। আজ বলব, প্রবাসের এই মাটিতে পা রেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে মূল্যবান কী হারিয়েছি।
আরও পড়ুন
মহাসড়কে গাড়ির তেল ফুরালেই জরিমানা
জার্মানিতে এসে আমি প্রথম যে জিনিসটি হারিয়েছি, তা হলো- ‘নির্ভর করার মতো মানুষ’। দেশে থাকতে আমরা জীবনের অনেক ছোট ছোট স্বাচ্ছন্দ্যকে খুব স্বাভাবিক মনে করি, যার মূল্য প্রবাসে না এলে বোঝা যায় না। দিনশেষে বাড়ি ফিরলে খাবার তৈরি থাকা, অসুস্থতায় কেউ একজন ওষুধ এনে দেওয়া, কিংবা কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো নিয়ে আমাদের আলাদা করে ভাবতেই হতো না। পেছনে পরিবার, বন্ধু আর চেনা মানুষের একটা বড় বলয় কাজ করত।
প্রবাস জীবনের নির্মম সত্য হলো- এখানে একজন মানুষকে তার পুরো জীবনটা একদম একাই টেনে নিয়ে যেতে হয়। শরীর যতই ক্লান্ত থাকুক, অফিস থেকে গভীর রাতে ফিরে যখন দেখা যায় ফ্রিজে কোনো খাবার নেই, তখন নিজেকেই রান্নাঘরে দাঁড়াতে হয়।
শনিবারে যখন একটু বাড়তি ঘুমাতে ইচ্ছে করে, তখন স্তূপাকার কাপড়, ঘর পরিষ্কার আর সপ্তাহের বাজার করার ব্যস্ততা দরজায় কড়া নাড়ে। এই কাজগুলো করে দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো মানুষ এখানে নেই।
এর পরেই যে জিনিসটি হারিয়ে যায়, তা হলো ‘সময়’ এবং ‘স্বস্তি’। বাংলাদেশে বন্ধুদের সাথে হুটহাট আড্ডায় মেতে ওঠা, মাঝরাতে চা খেতে বের হওয়া কিংবা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কারও বাসায় চলে যাওয়াটা ছিল ভীষণ সহজ।
প্রবাসে এসে দেখলাম, এখানে সবকিছুর জন্যই ক্যালেন্ডার মেপে আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়। সবাই ব্যস্ত, আর এই ব্যস্ততার শহরে সম্পর্কগুলোকেও টিকিয়ে রাখতে হয় ঘড়ির কাঁটা ধরে সময় বিনিয়োগ করে।
শুরুর দিনগুলোয় ভাষা না জানার কারণে এক অদ্ভুত ভীতি কাজ করত। দোকানে গিয়ে কথা বলতে ভয় লাগা, কোনো দাপ্তরিক চিঠি এলে পাঠোদ্ধার করতে না পারা এবং সারাক্ষণ ‘একটা ভুল হয়ে গেল কিনা’—এমন এক মানসিক অস্বস্তি তাড়া করে বেড়াত। যারা আজ নতুন কোনো দেশে পা রেখেছেন, তারা হয়তো এই অনুভূতির সাথে সহজেই একাত্ম হতে পারবেন।
‘জার্মানি আমাকে শুধু একটা চাকরি দেয়নি, বরং এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে যে নিজের সমস্যার সমাধান নিজেই খুঁজে নিতে পারে।’
তবে একটা দীর্ঘ সময় পার করার পর আমি উপলব্ধি করেছি- আমি শুধু হারিয়েই যাইনি, বিনিময়ে অনেক কিছু পেয়েছিও।
চরম প্রতিকূলতার মাঝে নিজের দায়িত্ব নিতে শিখেছি, নিজের ওপর ভরসা করতে শিখেছি। আজ যদি রাত বারোটাতেও আমাকে রান্না করতে হয়, আমি তা অনায়াসেই পারি। আজ যে কোনো নতুন সংকটের মুখোমুখি হলে আমি আর সহজে ভেঙে পড়ি না। কারণ মন জানে, এর চেয়েও অনেক কঠিন সময় আমি অতীতে একা পার করে এসেছি।
অনেকেই প্রায়শই জিজ্ঞেস করেন, ‘ইউরোপে আসা কি আসলেই সার্থক?’
আমি সবসময় একটা কথাই বলি- আপনি যদি শুধু টাকার অংক গুনতে আসতে চান, তবে হয়তো একদিন চরম হতাশ হবেন। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে ইতিবাচকভাবে বদলে ফেলতে চান, সম্পূর্ণ নতুন একটা জীবন গড়তে চান এবং নিজের সক্ষমতার সীমানাকে ভাঙতে চান- তবে প্রবাস আপনাকে এমন এক জীবনমুখী শিক্ষা দেবে, যা পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কখনো শেখাতে পারবে না।
আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয় জার্মানিতে এসে আমি আমার চেনা অনেক কিছু হারিয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেই হারানোর মধ্য দিয়েই আমি আমার নিজের একটা পরিপক্ব এবং ‘নতুন সংস্করণ’কে খুঁজে পেয়েছি। প্রবাস জীবনের এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় উপহার।
যারা এরই মধ্যে প্রবাসে আছেন, জীবনের সব গুছিয়ে নেওয়ার পরও মাতৃভূমির ঠিক কোন জিনিসটা আপনারা সবচেয়ে বেশি মিস করেন? আর যারা এখনো দেশে আছেন, বিদেশ বিভুঁইয়ের জীবন নিয়ে আপনাদের সবচেয়ে বড় কৌতূহল বা ধারণাটি কী? মন্তব্য করে জানাতে পারেন।
এমআরএম








