হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাতীয় তেল ট্যাঙ্কারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ভয়াবহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলায় ট্যাঙ্কারে কর্মরত এক ভারতীয় ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন ও আরও আটজন ক্রু সদস্য গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুজন ইউক্রেনের নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) দিনগত রাতে ইরানের ওপর টানা তৃতীয় রাতের মতো বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। তার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে এই হামলা চালায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

জানা গেছে, ওমানি জলসীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ শিপিং লেনে ট্রানজিট করার সময় আমিরাতের জাতীয় মালিকানাধীন তেলের ট্যাঙ্কার ‘মম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়া’ লক্ষ্য করে ইরান এই প্রাণঘাতী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করে। এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে।

আরও পড়ুন

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন / টানা ২০০ দিন সমুদ্রে ভাসছে বিমানবাহী রণতরি, চাপে মার্কিন নৌবহর

বিবৃতিতে আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানায়, এই নজিরবিহীন সামরিক উসকানির জবাব দেওয়ার এবং নিজের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রেখে নাগরিক, বাসিন্দা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও যোগ করেছে যে, তারা যে কোনো বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ স্তরের প্রস্তুতি ও সর্তকতা বজায় রাখছে এবং দেশের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিষ্পত্তিমূলক জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে বর্তমানে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক চরম প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধাবস্থা চলছে। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক বা শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।

নতুন করে এই যুদ্ধাবস্থা ও হামলা শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর মূল্য ৮১.৯২ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। যদিও চলমান এই যুদ্ধের সময়কালে তেলের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, তবে বর্তমানের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর নতুন উপর্যুপরি হামলা শুরু করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, এই অব্যাহত হামলার মাধ্যমে ইরানি বাহিনীর ওপর চড়া মূল্য চাপানো হবে ও হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানি সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প-জায়েদি বৈঠক / হরমুজের বিকল্প পথ, তেল-গ্যাস খাতে একাধিক চুক্তি করবে ইরাক-যুক্তরাষ্ট্র

এই ঘোষণার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই অভিযানকে ‘আরেকটি বড় আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের ওপর খুব কঠোর আঘাত করছি। এটি আরও অব্যাহত থাকবে ও দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী ঘটে। আমরা তাদের সব আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিচ্ছি ও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নিচ্ছি। সেই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আবারও কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ ফিরিয়ে আনছি।

এর পাশাপাশি ট্রাম্প তার প্রশাসনের পূর্ববর্তী অবস্থান পরিবর্তন করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ওপর টোল বা ফি ধার্য করার নতুন বিবরণ দিয়ে বলেন, আমরা বিশ্বের একটি অত্যন্ত ধনী অঞ্চলকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। এর জন্য আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই আমরা এখন থেকে এই আন্তর্জাতিক সুরক্ষার বিনিময়ে অন্যান্য দেশের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা টোল আদায় করবো

সূত্র: এনডিটিভি

এসএএইচ