ওমানে আজ শনিবার মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ইরানের ওপর কঠোর শর্তারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং সেখানে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আর হামলা চালানো হবে না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান গোপনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কাছে স্বীকার করেছে যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো তাদের ভুল ছিল। তবে তেহরান এই ঘটনার জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ একটি উগ্রপন্থী বা বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া সত্ত্বেও দুই পক্ষই আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এই হামলাকে পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।

এর আগে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা দেবে।

বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে শীর্ষস্থানীয় এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান দাবি করেছে ইরানের একটি ‘উচ্ছৃঙ্খল’ উগ্রপন্থী দল শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

ওই কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘তারা (ইরানি প্রতিনিধি দল) আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে বলেছে, “আমাদের বড় ভুল হয়ে গেছে। আমরা ভুল করেছি। আসুন আলোচনা চালিয়ে যাই। ”’

গতকাল শুক্রবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের নেতৃত্বের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ইরানকে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিতে হবে এবং জাহাজে হামলা চালানো বন্ধ করতে হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তারা হয় আমাদের এই লিখিত বা প্রকাশ্য বিবৃতি দেবে, অন্যথায় তাদের জন্য এর ফল শুভ হবে না।’

পাশাপাশি, হোয়াইট হাউস চায় ইরান যেন প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো তাদের ভুল ছিল।

ওমানে হাই-প্রোফাইল বৈঠক ও কাতারি মধ্যস্থতা

আজ শনিবার ওমানে অনুষ্ঠেয় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আলোচনায় নিবিড়ভাবে জড়িত বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের।

এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা হ্রাস এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গতকাল কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইরানে সফর করেছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান আমাদের কাছে “আলোচনা” চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা তাতে সম্মত হয়েছি, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে—পূর্বের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ।’

চলতি সপ্তাহের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গত জুনে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সইয়ের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা। তবে শুক্রবার নতুন করে কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।

ওমানি জলসীমায় মার্কিন-প্রস্তাবিত রুট ব্যবহার করার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়। তবে ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির একমাত্র ‘নিরাপদ’ পথটি তাদের নিজস্ব জলসীমার ভেতর দিয়ে গেছে।

গত মাসে অবশ্য দুই পক্ষ একটি ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা। এই চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ও ওমানের অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক পরিষেবা নির্ধারণে আলোচনা করার কথা রয়েছে।

সংঘাতের সময় ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। এ জন্য তারা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে, যা ট্রানজিট পারমিট নিয়ন্ত্রণ করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ওমানের সমন্বয়ে ইরানই এই প্রণালিটি পরিচালনা করবে এবং যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে সম্ভাব্য ‘সার্ভিস ফি’ আদায়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।