জলাবদ্ধতা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক, সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকা, বিশেষ করে মিরপুর, কারওয়ানবাজার, মালিবাগ, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা ও অলিগলিতে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থা পানির চাপ সামলাতে পারে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের খাল, ড্রেন ও নালাগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের নগরায়ণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক সময়ের প্রাকৃতিক জলাধার ও কৃষিজমি আজ কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের ঢাকার মতিঝিল এলাকা ছিল বিস্তীর্ণ ঝিল, ধানমন্ডিতে ছিল ধানখেত, আর গুলশান এলাকাজুড়ে ছিল কৃষিজমি ও জলাভূমি। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এসব জলাধার ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়েছে। আজ সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো। যদিও এ পরিবর্তনকে পুরোপুরি উলটে দেওয়া সম্ভব নয়, তবুও এটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা, প্রাকৃতিক জলাধার ও খালগুলোর গুরুত্ব বুঝে সেগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।

বর্তমানে ঢাকা শহরের অন্যতম বড় সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা, যার প্রধান কারণ প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধ্বংস ও খালগুলোর দখল এবং দূষণ। এক সময় শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খালগুলো বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিত। কিন্তু আজ সেই খালগুলো সংকুচিত, দখলকৃত এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরাট। প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য সবকিছু মিলিয়ে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাঘাট ডুবে যায়, জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, এক সময় ঢাকা শহরে প্রায় ৬৫ থেকে ৭৭টি ছোট-বড় খাল ও লেক ছিল। কোনো কোনো সূত্রমতে, স্বাধীনতার পরও এ সংখ্যা ৫৭টির বেশি ছিল। পান্থপথ খাল, পরিবাগ খাল, ধোলাইখাল, সেগুনবাগিচা খাল, নারিন্দা খাল এখন ইতিহাসের পাতায় রায়েরবাজার খালের কিছু অংশ, আবদুল্লাহপুর খালের বিভিন্ন অংশ এবং বাউনিয়া খালের বেশকিছু অংশ দখলের কারণে সংকুচিত হতে হতে বিলীন প্রায়। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে ২৬টি খালের দখল-দূষণ দূর করে সচল করার চেষ্টা চলছে। চট্টগ্রাম মহানগরীরও একই অবস্থা-চট্টগ্রাম নগরীতে এক সময়ে ১১৮টির বেশি খাল ছিল, যার বেশির ভাগেরই এখন আর অস্তিত্ব নেই। কিছু খাল আছে, যেগুলো দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে, এগুলো একসময় প্রশস্ত ও প্রবাহিত জলাধার ছিল। এসব খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে নগরীজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন জরিপ মতে, চট্টগ্রামে ২৯৭টি জায়গার মধ্যে ওয়াসার ৭৫টি পাইপলাইন, কর্ণফুলী গ্যাসের ৫৬টি ও টিঅ্যান্ডটির ১৮টি পাইপলাইনের কারণে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া আবর্জনায় ভর্তি হয়ে অকেজো হয়ে আছে অন্তত ১৪৮টি ড্রেন এবং ৮টি নিচু কালভার্ট। নগরীর জলাবদ্ধতার অন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হলো ওয়াসার পাইপ, গ্যাসের পাইপ, টিঅ্যান্ডটির পাইপ, নিচু কালভার্ট ও পিডিবির লাইন কাভার বক্স ইত্যাদি। পরিত্যক্ত ড্রেন, ড্রেনের ওপর ডাস্টবিন, ডাস্টবিনের ভাঙা স্লাব, ব্রিজের পাশে ডাস্টবিন ও খাল-নালা বন্ধ করে অবৈধভাবে চলাচলের রাস্তা নির্মাণ হওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত।

উল্লেখ্য, উভয় মহানগরসহ দেশের অন্যান্য শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালগুলো একসময় নিষ্কাশন, পরিবেশ রক্ষা ও নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। কিন্তু অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে এসব খাল আজ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তাই খাল উদ্ধারে কার্যকর কিছু ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, খালগুলোর সঠিক সীমানা নির্ধারণ ও জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খালের প্রকৃত অবস্থান চিহ্নিত করে তা সরকারি নথিতে সংরক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে কঠোরভাবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, খাল পুনঃখনন ও সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা, পলি ও আবর্জনা অপসারণ করে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, খালে যেন নতুন করে ময়লা বা বর্জ্য ফেলা না হয়, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, খালের দুপাড়ে সবুজায়ন ও হাঁটার পথ তৈরি করা যেতে পারে, যা খালকে দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্যও বাড়াবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা খাল রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তবে খাল পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় নজরদারিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাল দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবছর জুন-জুলাই মাস থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হতে শুরু করে। যেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে শহরগুলোর রাস্তাঘাট বর্ষায় রূপ নেয়, সেখানে মুষলধারে বৃষ্টি হলে কী অবস্থা হতে পারে, তা কারও অজানা নয়। শহরের রাস্তাগুলো মনে হয় বর্ষার বিলের মতো, শত শত গাড়ি প্রায় অর্ধনিমজ্জিত হয়ে আটকা পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা; বস্তিবাসী এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের তো কোনো সীমা থাকে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সড়কপথ, রেলপথ, এমনকি বিমানবন্দরও পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ফলে বিমান ওঠানামা করতে পারেনি, ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল, অধিকাংশ বাস-গাড়ি ছিল অর্ধনিমজ্জিত। ঢাকার মিরপুর, মালিবাগ, মুগদা, শাহজাহানপুরসহ অনেক স্থানে বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় অনেকে মাছ শিকার করে, শিশুরা সাঁতার কাটে, ম্যানহোলের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। প্রতি বছরই এমনটি হয় এবং এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অবশ্যই দরকার। সেজন্য খালকে একটি জীবন্ত পরিবেশগত সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে, শুধু পানির উৎস হিসাবে নয়; তাই বর্তমান খালকাটা কর্মসূচিতে দেশের প্রত্যেকটি শহরের দখলকৃত সব খাল, ড্রেন ও নালাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। উপরন্তু, খালগুলোকে জীবিত রাখতে পারলে তা শুধু পানি নিষ্কাশনের কাজই করবে না, বরং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানুষের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখবে।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়