প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকারের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস জনগণ। তাই জনগণের সমর্থন যতক্ষণ থাকবে এবং জনগণ যতক্ষণ পাশে থাকবে, বিএনপি কোনো বাধাই মানবে না। আমরা দেশটাকে পুনর্গঠন করতে চাই। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব ইনশাল্লাহ।’ সোমবার বরিশালের দুটি স্থানে বৃক্ষরোপণ ও ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১০টায় সড়ক পথে বরিশালের গৌরনদীর বাটাজোরে এসে পৌঁছান। তাকে স্বাগত জানান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। পরে প্রধানমন্ত্রী সেখানে শরিকল খালের পাশে একটি গাছের চারা লাগান। চারা লাগানোর পর এর যত্ন নিতে সবাইকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি এই গাছকে যত্ন করে দেখে রাখেন তাহলে, এই গাছও একদিন আপনাদের দেখবে।’ তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নতুন স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই আয়োজনে খালের দুপাড়ে একযোগে আড়াই হাজার গাছ লাগানো হয়। এরপর স্থানীয় অশ্বিনী কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে গৌরনদীর ৬১৩ জন সুবিধাভোগী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী।

অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত নারীদের ডেকে জানতে চান, ‘আপনি ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন? এই কার্ড নিয়ে কী কী উপকার পেয়েছেন?’ এ সময় পারুল আখতার নামে এক নারী বলেন, ‘এই কার্ড পেয়ে অনেক উপকার পেয়েছি। আমি আশা করি, আগামীতেও প্রধানমন্ত্রী আমাদের এরকম সহযোগিতা করবেন।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, আরও অনেক পরিবার আছে, যারা এখনও কার্ড পায়নি। তবে আগামীতে তারাও পাবে। সারা দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের নারী প্রধানদের হাতে ধীরে ধীরে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে সকল পরিবারের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

দেশের সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে ভালো থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান যে ধর্মের অনুসারীই হই, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য সব ধর্মের মানুষ মিলে শান্তিতে বসবাস করার। সবাইকে মানবিকতার ভিত্তিতে বিচার করে দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই। আমরা একটি কথা বলে থাকি, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ এবার আরেকটি কথা বলতে চাই, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। ‘আগামী দিনে সবাই যাতে একটু ভালো থাকতে পারি, সবাই যাতে একটু ভালোভাবে চলতে পারি-সেটিই হচ্ছে বর্তমান সরকারের রাজনীতি এবং আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।’

গৌরনদীর কর্মসূচি শেষে বরিশাল নগরীর উদ্দেশে রওয়ানা হন প্রধানমন্ত্রী। পথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের দুধারে মানব প্রাচীর তৈরি করে তাকে স্বাগত জানান হাজার হাজার জনতা। পথে বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় যোগ দেন তারেক রহমান। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর রওয়ানা হলে পথিমধ্যে বরিশাল ক্যাডেট কলেজ এলাকায় শিশু নিকেতন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে ভিড় জমায় শিক্ষার্থীরা। তাদের দেখে গাড়ি থামিয়ে শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শিশুদের সঙ্গে তিনি সেলফি তোলেন। দুপুর সোয়া দুইটা নাগাদ বরিশাল নগরীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় সাগরদি খালের পাড়ে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আরেকটি গাছের চারা লাগান তিনি। এ সময় খালের দুপাড়ে একযোগে লাগানো হয় সাড়ে তিনশ গাছের চারা। পরে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এ দেশের সব মানুষ মিলে যুদ্ধ করে আমরা এই দেশ স্বাধীন করেছি। মাত্র কয়েকদিন আগে আমরা লড়াই সংগ্রাম করে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিদায় করেছি। এভাবে সবাই যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো কাজগুলো করি তাহলে সবাই উপকৃত হবে। আসুন এই বৃক্ষরোপণের দিনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই-যে যার যার অবস্থান থেকে পরিবেশকে সুন্দর ও ভালো রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

বিকালে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বরিশাল জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনসমূহের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। বরিশাল সদর আসনের এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ারের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন, নৌ পরিবহণ ও সেতু প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, বরিশাল-২ আসনের সংসদ-সদস্য সরফুদ্দিন সান্টু, বরিশাল-৬ আসনের সংসদ-সদস্য আবুল হোসেন খান, বিসিসি প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতউল্লাহ, এবায়েদুল হক চান, বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার ও জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিনসহ কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। সাংগঠনিক সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।

সকালে প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে পথে পথে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে এবং শুভেচ্ছা জানাতে সকাল থেকে হাজারো বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ মহাসড়কের দুপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। গাড়িবহর ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের নিমতলা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বরইতলা বাসস্ট্যান্ড, মাদারীপুরের কালকিনি ও ডাসারের বিভিন্ন পয়েন্ট অতিক্রমের সময় তিনি রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা ও অভিবাদনের জবাব দেন।