আওয়ামী লীগ আমলের সীমাহীন অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ থাকলেও দেশ ও জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে কখনো সামনে নেওয়া যায় না। দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া তখনই সম্ভব, যদি আমরা পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি।
শনিবার দুপুরে রাজধানীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যাদের হারিয়েছি, আপনারা যারা কষ্ট স্বীকার করেছেন, যন্ত্রণা ভোগ করছেন, আমাদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ছিল এই দেশ, দেশের মানুষ এবং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন মানেই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন। আজ আমাদের হাতে সেই সুযোগ এসেছে। আমরা জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই না।
শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের আবেগঘন বক্তব্যের পর নিজের পরিবার ও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে তারেক রহমান বলেন, আমি যদি মাকে (খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতে পারতাম, গেল ১৭ বছর আপনার ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার হয়েছে, আমি কি সেই নির্যাতনের প্রতিশোধ নেব? সেই ক্ষমতা আমার আছে। আমার বিশ্বাস, আমার মা আমাকে বলতেন, প্রতিশোধ নয়, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাও। আমার ছোট ভাইকেও একই প্রশ্ন করলে সেও মায়ের মতোই একই উত্তর দিত।
জুলাই বিপ্লবের অর্জন ‘কোনো একক ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের নয়’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আমি সব সময় বলে থাকি, ৫ আগস্ট আমরা যে অর্জন করেছি, তা কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; বরং এই অর্জন দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১,৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও আমি আমার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে যথাসম্ভব খোঁজখবর রাখছিলাম। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছেন; তবে আমার হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুলাই আন্দোলনেই প্রায় ২ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৩০ হাজারের মতো মানুষ সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও দেশ যথাসাধ্য আপনাদের মূল্যায়ন করবে, আপনাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাবে। একই সঙ্গে আপনাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়েছে, যেভাবে আপনার আপনজনকে হত্যা করা হয়েছে, অবশ্যই দেশের আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিচার হবে। শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি, আহতদের জীবনমান নিশ্চিত করতে এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, শুধু আমার দলেরই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং ৫ আগস্টের আন্দোলন সফল করা সব অরাজনৈতিক ব্যক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, স্বৈরাচার যেভাবে দেশের কোটি মানুষের ওপর অবিচার করেছিল, আমরা বিচারের নামে যেন কারও প্রতি অবিচার না করি। সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ আমরা যদি বিচার করতে গিয়ে নিজেরা অবিচার করে ফেলি, তবে ওপারে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না। সেজন্য আইন ও নিয়মনীতি বজায় রেখে, প্রয়োজনে কিছুটা সময় নিয়ে হলেও অন্যায়কারী ও হত্যাকারীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আরেকজনকে বঞ্চিত রেখে আমাদের মূল্যায়ন হবে; বরং আজকে সময় এসেছে আমরা দেশকে কী দিতে পারি, দেশের জন্য কী করতে পারি তা ভাবার।
তারেক রহমান বলেন, ত্যাগ কেবল তারাই করতে পারে, যাদের ত্যাগ করার মতো শক্তি ও সাহস আছে। বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে মনে করি-তাদের প্রত্যেকেরই দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং ঐক্যবদ্ধ রাখার সেই সাহস ও শক্তি আছে। আসুন, আমাদের মূল লক্ষ্য হোক ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হোক দেশ ও দেশের জনগণ।
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন এবং আহত আল মিরাজ ও আমিনুল ইসলাম ইমনের হাতে ‘স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে উপস্থিত অন্য শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছেও এই স্মারক পৌঁছে দেওয়া হয়।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা এবং কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি জামিল সিদ্দিকী। এছাড়া আয়োজক সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ এবং ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’র সভাপতি গোলাম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল বক্তব্য দেন।
জুলাই হত্যার বিচার চাইলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা : অনুষ্ঠানে শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। তিনি ভাই হত্যার দ্রুত বিচার এবং সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার দাবি জানান। এদিকে জুলাই যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করার আহ্বান জানান শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম।








