রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি নতুন আলোচনা জোরালো হয়ে উঠছে-রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট হিসাবে অথবা দেশের অন্য কোনো স্থানে স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) স্থাপনের সম্ভাবনা। সরকারের বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ২০১৬ অনুযায়ী, জ্বালানি নিরাপত্তা টেকসই করতে ভবিষ্যতে আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রূপপুরে আরও দুটি ইউনিট নির্মাণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও পরিচালিত হয়েছিল।

বর্তমানে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ ১৮,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৫,০০০ থেকে ১৭,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। ভূ-রাজনৈতিক কারণ, জ্বালানি অনুসন্ধানে জাতীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং রিজার্ভের টানাপোড়েনের কারণে আমদানিনির্ভর জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা ২০২৩ অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ৬১ গিগাওয়াটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে এসএমআর কি আদৌ এ মুহূর্তের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত?

এসএমআর হলো সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি। রূপপুরের প্রতিটি ইউনিটের ১,২০০ মেগাওয়াটের তুলনায় এটি অনেক ছোট। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮টি দেশে মোট ৭২টি বিভিন্ন মডেলের এসএমআর ডিজাইন তৈরি হয়েছে। এসএমআর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হাইড্রোজেন জ্বালানি উৎপাদন ও সমুদ্রের নোনা পানি বিশুদ্ধকরণেও ব্যবহার করা যাবে। বড় চুল্লির তুলনায় এসএমআর অনেক বেশি নিরাপদ এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক কম। ফলে দ্বীপ, উপকূল ও ডেটা সেন্টারের মতো বিভিন্ন স্থানে ভাসমান কিংবা স্থলভিত্তিকভাবে এসএমআর স্থাপন করা যাবে।

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এসএমআর চালু রয়েছে রাশিয়ার দুর্গম উপকূলীয় অঞ্চলের পেভেক বন্দরে একটি ভাসমান জাহাজের ওপর। সেখান থেকে বর্তমানে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়া, দেশটিতে আরও দুটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির কাজ চলছে-যার একটি একই অঞ্চলের কেপ নাগলোইনিন উপকূলে তৈরি হতে যাওয়া ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যটি সাইবেরিয়া অঞ্চলের সেভারস্ক শহরে ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র। চীনের উপকূলীয় শহর রংশেংয়ের শিদাও বে-তে দুটি পারমাণবিক চুল্লি থেকে বর্তমানে মোট ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এর পাশাপাশি, দেশটির হাইনান দ্বীপপ্রদেশের চাংজিয়াং উপকূলীয় এলাকায় আরও একটি নতুন ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির কাজ চলছে। আর্জেন্টিনাতেও নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ছোট আকারের ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএমআর কানাডা, পোল্যান্ড ও চেক প্রজাতন্ত্রে নির্মাণের জন্য চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে তিনটি সমস্যা। তেল, তরলীকৃত গ্যাস ও কয়লার ওপর বর্তমানে ৬২.৫ শতাংশ জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে আরও অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি-বর্তমানে ভারত থেকে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, যা মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১১ শতাংশ। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তির সীমাবদ্ধতা-সৌরশক্তি জাতীয় গ্রিডে মাত্র ২.৩ শতাংশ অবদান রাখছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে বড় আকারের সৌর প্রকল্পের জন্য জমির তীব্র সংকট রয়েছে। তাছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তির অনিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

এ বাস্তবতায় এসএমআর একটি আকর্ষণীয় বিকল্প। এসএমআর কারখানায় তৈরি করে সরাসরি স্থানে বসানো যায়, ফলে নির্মাণ সময় (৩ থেকে ৫ বছর) এবং প্রাথমিক বিনিয়োগ উভয়ই বড় আকারের চুল্লির তুলনায় কম। এটি সপ্তাহের সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা নির্ভরযোগ্য বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, যা সৌর বা বায়ুশক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। জ্বালানি হিসাবে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের কারণে এটি কার্বন নির্গমন শূন্যের কাছাকাছি রাখে এবং প্রতি ১০ থেকে ২০ বছরে মাত্র একবার জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির মতো প্রতিনিয়ত আমদানির ঝামেলা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এবং কলোরাডো স্কুল অফ মাইনসের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে ১ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের রিঅ্যাক্টর উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদ্যুৎবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭১ শতাংশকে সেবা দিতে পারবে। উল্লেখ্য, সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম মাইক্রো-মডুলার রিঅ্যাক্টরগুলো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডিজাইন পর্যায়ে রয়েছে। এটি এসএমআরের তুলনায় আরও ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর।

তবে এত সম্ভাবনার পরও বাংলাদেশে এখনই এসএমআর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কয়েকটি কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত, অভিজ্ঞতার সংকট। রূপপুর ১ ও ২ আমাদের প্রথম দুটি পারমাণবিক চুল্লি, যা এখনো চালু হয়নি। একটি পারমাণবিক প্রকল্প পরিচালনার যে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, দক্ষ জনবল এবং ব্যবস্থাপনাগত পরিপক্বতা দরকার, তা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। আইএইএ’র মতে, এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জনে কমপক্ষে এক প্রজন্মের প্রচেষ্টা লাগে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠিত হলেও এসএমআরের মতো নতুন প্রযুক্তির জন্য আলাদা লাইসেন্সিং কাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং স্বাধীনভাবে পরিদর্শনের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অপরিপক্বতা। বিশ্বে বর্তমানে ৭২টির বেশি বিভিন্ন ধরনের এসএমআর মডেল তৈরি হলেও বাণিজ্যিকভাবে চালু রয়েছে শুধু রাশিয়া ও চীন মিলে দুটি এবং নির্মাণাধীন রয়েছে রাশিয়া, চীন ও আর্জেন্টিনাসহ মোট চারটি চুল্লি। বেশিরভাগ মডেল এখনো নকশা বা অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। চতুর্থত, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিক্রেতা নির্বাচনের জটিলতা। কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসএমআর কেনা হবে? জ্বালানি সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত হবে? তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কোথায় যাবে? এসব প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনই পাওয়া দুষ্কর। পারমাণবিক প্রযুক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আয়ুষ্কাল দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং একক দেশের ওপর প্রযুক্তিগত সহায়তা, ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরশীলতা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষত বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে।

তাহলে করণীয় কী? আমাদের বোঝা দরকার, এসএমআরকে না বলা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তুতির কথা বলা। আইএইএ’র মাইলস্টোন পদ্ধতি অনুযায়ী, একটি নতুন পারমাণবিক কর্মসূচি পরিপক্ব হতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ বছর লাগে। বাংলাদেশের উচিত রূপপুর ১ ও ২ নম্বর ইউনিট সফলভাবে চালু করা এবং কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বছর পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করা। একইসঙ্গে পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শক্তিশালী করা এবং দক্ষ পারমাণবিক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করা। দেশের বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদা, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনীতির স্কেল বিবেচনায় রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট হিসাবে বড় আকারের রিঅ্যাক্টর স্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত হবে। রূপপুর ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের জন্য যে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, কুলিং সিস্টেম, নিরাপত্তা বলয় এবং প্রশাসনিক ভবন তৈরি হয়েছে, তার সিংহভাগই ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটে ব্যবহার করা যাবে। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তবে রিঅ্যাক্টর নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা, উপযুক্ত এসএমআর প্রযুক্তি যাচাই এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। পুরোনো কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে এসএমআর দিয়ে প্রতিস্থাপন করার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরির কাজ এখনই শুরু করা উচিত। জ্বালানি নিরাপত্তার পথ দীর্ঘ, তবে সুচিন্তিত ও ধাপে ধাপে নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমেই শুধু সেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]