রেশম লতা
‘বাংলা সাহিত্যেও কেউ কেউ অ্যাফোরিজম লিখেছেন, কদাচিৎ কেউ কেউ অসচেতনভাবে অ্যাফোরিস্টিক কবিতাও লিখেছেন। তবে আমি সচেতনভাবেই অ্যাফোরিস্টিক পোয়েট্রি লিখেছি, সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছি এবং এ ঘরানার নাম দিয়েছি ‘ঝিনুককবিতা’।’ নকিব মুকশির এ কথার সূত্র ধরে ঝিনুককবিতা নিয়ে লিখতে বসা।
কবিতার ইতিহাস মূলত মানবসভ্যতার নন্দনতাত্ত্বিক ও ভাষিক বিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীন মৌখিক ঐতিহ্য থেকে মহাকাব্য, গীতিকবিতা ও নাট্যকাব্যের বিকাশ; পরবর্তীকালে রোমান্টিকতাবাদ, প্রতীকবাদ, চিত্রবাদ, আধুনিকতাবাদ এবং উত্তরাধুনিকতার মতো সাহিত্য-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কবিতা ক্রমাগত তার ভাষা, নির্মাণকৌশল ও নন্দনচেতনায় পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে গদ্যকবিতা, কংক্রিট কবিতা, মিনিমালিস্টিক কবিতা, অ্যাফোরিস্টিক কবিতা, মাইক্রোপোয়েট্রি ও অন্যান্য সংক্ষিপ্ত কবিতার রূপের উত্থান প্রমাণ করে, কবিতা ধীরে ধীরে বর্ণনামূলক বিস্তারের পরিবর্তে নিবিড় সংকেত, ব্যঞ্জনা ও বহুমাত্রিক অর্থ উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
এই ধারাবাহিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নকিব মুকশির ঝিনুককবিতাকে সংক্ষিপ্তায়িত কাব্যপ্রকাশের একটি সমকালীন রূপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ঝিনুক যেমন তার ক্ষুদ্র অবয়বের মধ্যে মুক্তার সম্ভাবনা ধারণ করে, তেমনি ঝিনুককবিতাও স্বল্প শব্দ, সংযত ভাষা ও ব্যঞ্জনাময় নির্মাণের মাধ্যমে বহুবিধ অর্থ, দর্শনচিন্তা ও অনুভবের পরিসর সৃষ্টি করতে সচেষ্ট। এতে বক্তব্যের চেয়ে ইঙ্গিত, বর্ণনার চেয়ে নীরবতা, আর প্রত্যক্ষ উচ্চারণের চেয়ে এর অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ঝিনুককবিতা কেবল একটি ক্ষুদ্রাকৃতির কবিতা নয়; বরং এটি ভাষার ব্যবহার, নান্দনিক সংহতি ও গভীর ব্যঞ্জনাধর্মিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি কাব্যরীতি। নকিব মুকশি তার এই ঝিনুককবিতাকে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যে আবদ্ধ করেছেন—
১. সংক্ষিপ্ত, তবে গভীর ভাবব্যঞ্জক।
২. দার্শনিক সত্য বা অন্তর্দৃষ্টিমূলক চিন্তার বীজ ধারণ।
৩. কাব্যালংকার, কাব্যাঙ্গিক ইত্যাদির উপস্থিতি।
৪. পাঠককে আন্তদর্শনীয় ব্যাখ্যার সুযোগ এবং
৫. প্রজ্ঞাদীপ্ত মোচড়।
একজন কাব্যালোচক হিসেবে নকিব মুকশির এই কাব্য–ইশতেহার ও বইটির কবিতাগুলোর ভূগোল ঘেঁটে এর সত্যতা যাচাই করা একান্ত আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যাফোরিজম হলো একটি সাহিত্যিক উক্তির রূপ, আর অ্যাফোরিস্টিক কবিতা হলো এমন এক ধরনের ক্ষুদ্র কবিতার প্রকরণ বা শৈলী, যাতে অ্যাফোরিজমের গুণ বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ ঝিনুককবিতায় অ্যাফোরিজমের নির্যাস থাকে, কিন্তু অ্যাফোরিজমে ঝিনুককবিতা থাকে না। প্রথম দর্শনে ঝিনুককবিতা ও অ্যাফোরিজমের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়, কারণ উভয়ই সংক্ষিপ্ত, গভীর ভাবসম্পন্ন এবং পাঠককে চিন্তার দিকে আহ্বান করে। কিন্তু এই মিল কেবল বাহ্যিক।
অ্যাফোরিজম মূলত দর্শন বা বাণী ভাষ্যের গদ্যোক্তি। এটি একটি বক্তব্যকে যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত ও স্মরণযোগ্য করে তোলে। এর শক্তি যুক্তি, প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ সত্যে। এখানে একটি ধারণা সরাসরি রূপকের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে ঝিনুককবিতা কোনো বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত ও ঘনীভূত রূপকের কাব্যাঙ্গিক প্রকাশ। এর মূলে থাকে ভাষার নন্দন, ব্যঞ্জনা, চিত্রকল্প, কবিতার কাঠামো, গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন অর্থ ও কাব্যদর্শন। ঝিনুককবিতা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না দিয়ে নানা ব্যাখ্যার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রাখে। যেমন—
‘পৃথিবীর সমস্ত জুতারা
শীতভোরে
ভাপ ওঠা সেদ্ধ ধান।’
এটাকে অ্যাফোরিজমে কোনোভাবেই ফেলা যায় না। জুতা ও সেদ্ধ ধানের মধ্যকার আপাত-অসম সম্পর্ক একটি কাব্যিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। পাঠক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে অর্থ নির্মাণ করে এবং বোধের গহিনে ডুব দেয়। এই উন্মুক্ত ব্যঞ্জনাই ঝিনুককবিতার স্বাতন্ত্র্য। অ্যাফোরিজমের কেন্দ্রবিন্দু বক্তব্য, আর ঝিনুককবিতার কেন্দ্রবিন্দু কাব্যিক অভিজ্ঞান।
‘ভগবান
নিউট্রনের মতো—
নিষ্ক্রিয়, তবে জীবিত
নাথ, তবে অনাথ
প্রোটন
তারই নিত্যসঙ্গী
(গড, পৃ: ৩১)
এখানে পদার্থবিজ্ঞানের নিউট্রন ও প্রোটনকে ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর বৈপরীত্য ঈশ্বরের নীরব উপস্থিতির ধারণাকে ইঙ্গিত দেয়; একটি প্যারাডক্স তৈরি করে। আর ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, অথচ মানবজীবনের দুঃখে তার নীরব থাকার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার ভাষাকে পাশাপাশি বসিয়ে কবিতাটি চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী: নারীবাদের দ্বন্দ্বময় সংলাপ
‘ঝিনুকধানী’র একটা রূপকধর্মী কবিতা দেখা যাক—
‘মানুষই পৃথিবীর নিঠুর গলগ্রহ,
চেপে আছে
সারোগেট মাদারের শ্বাসনালি।’
(গলগ্রহ, পৃ: ৩১)
‘গলগ্রহ’ রূপকধর্মী কবিতা, যাতে মানুষকে এমন এক বোঝা বা পরজীবী শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা পৃথিবীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে। ‘ঝিনুকধানী’র কবি পৃথিবীকে সারোগেট মাদার বলেছেন। মানুষকে জন্ম না দিলেও মানুষকে ধারণ ও লালন করছে পৃথিবী, অথচ সেই মানুষই তার শ্বাসরোধ করছে। এ কবিতায় পরিবেশ ধ্বংস, জলবায়ু সংকট ও মানবসভ্যতার আত্মবিনাশী চরিত্র এই তিনটি স্তর একসঙ্গে বিরাজমান।
বর্তমান বাংলাদেশের কবিতা একরৈখিক নয়; বরং বহুস্বর, বহুমাত্রিক ও পরীক্ষামুখী। নব্বই-পরবর্তী প্রজন্ম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক তরুণ কবিদের লেখায় ভাষা, বিষয়, নির্মাণকৌশল ও নন্দনতত্ত্বে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। সমকালীন কবিতা এখন কেবল প্রেম, প্রকৃতি বা ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্র, ইতিহাস, প্রযুক্তি, পরিবেশ, যুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয়-রাজনীতি, লিঙ্গ, স্মৃতি ও অস্তিত্বের সংকটও এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘ঝিনুকধানী’র ‘পূজা’ কবিতায় কবি বাহ্যিক ধর্মাচারের পরিবর্তে আত্মিক শুদ্ধতা ও মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষের হৃদয়ের পূজা থেকে বিচ্যুতি ঘটলে ধর্ম স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ও অন্ধ বিশ্বাসের আশ্রয়ে পরিণত হয়। ব্ল্যাক পলিটিকস ও মন্দির প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়ে ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহারকে নির্দেশ করেছে। অল্প শব্দে দর্শন, ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতিকে একত্রে উপস্থাপনের মাধ্যমে কবিতাটি বহুমাত্রিক পরীক্ষাধর্মিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
‘স্বীয় হৃদয়ের পূজা থেকে সরে
বহির্বস্তুর পূজায় যখন পূজারি,
অন্ধকার-অন্ধকার ধার্মিক আর
ব্ল্যাক পলিটিকসের জঞ্জাল বাড়ে
ছেয়ে ফেলে মন্দিরের চারধার।’
(পূজা, পৃ: ৫২)
‘ঝিনুকধানী’র কবিতার ভাষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সুস্পষ্ট। অলংকারময় ও আবেগনির্ভর ভাষার পরিবর্তে অনেক সময় কবি ব্যবহার করছেন সংক্ষিপ্ত, ঘনীভূত ও প্রতীকসমৃদ্ধ ভাষা। কবিতায় প্রবেশ করেছে বিজ্ঞান, দর্শন, গণমাধ্যম, ইন্টারনেট, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ শব্দাবলিও অনায়াসে। ফলে কবিতা অনেক সময় বয়ানের পরিবর্তে ইঙ্গিতের শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থ সম্পূর্ণ হয় না।
সূর্য সুগোল লিচু হয়ে উঠলে
সক্রিয় হয়ে ওঠে আমাদের
কেমিক্যাল মেসেঞ্জার—
নাইট গাউন পরে শ্রান্ত দিন,
রাত আলোর বিশ্রামাগার।
(বিশ্রাম, পৃ: ৮০)
‘ঝিনুকধানী’র কবিতাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মিনিমালিজম। অল্প শব্দে গভীর অনুভব বা তীক্ষ্ণ উপলব্ধি প্রকাশের প্রবণতা। সমকালীন কবিতায় অণুকবিতা, অ্যাফোরিস্টিক কবিতা, গদ্যকবিতা এবং ভাঙা বাক্যগঠনের ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তপাঠ (ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি), পুরাণ, ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক ধারণার নতুন ব্যবহার সমকালীন কবিতাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।
তবে এ সময়ের কবিতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক কবিতায় অতিরিক্ত দুর্বোধ্যতা, অপ্রয়োজনীয় প্রতীকনির্ভরতা এবং কৃত্রিম জটিলতা পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে। কখনো কখনো ভাষার পরীক্ষা–নিরীক্ষা কবিতার আবেগ বা মানবিক স্পর্শকে আড়াল করে ফেলে। ফলে কিছু কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন হয়ে ওঠে। তেমনি ঝিনুকধানীর কিছু কবিতায় প্রতীক ও ভাষার নিবিড় নির্মাণ এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো পাঠকের তাৎক্ষণিক অনুভূতির পরিবর্তে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্র তৈরি করে। কেউ কেউ সেটাকে দুর্বোধ্যতার নিগূঢ়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের কাব্যপ্রবণতায় পাঠের অন্তর্দৃষ্টি গভীর হলে তা সহনীয় ধারায় চলে আসে এবং কবিতার দুর্বোধ্যতার পরিবর্তে অর্থের বহুমাত্রিকতা প্রকাশ পায়, যা সমকালীন কবিতার একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যও বটে। যেমন—
‘খোদা বিজ্ঞাপন দেয়
তারই মনোনিত গ্রন্থে,
মানুষ বিজ্ঞাপন দেয়
মাংসে মাৎসর্যে রূপে
জমিনে রমণে খুনে...’
(বিজ্ঞাপন, পৃ: ৪৩)
চলমান দশকে বাংলাদেশের কবিতা একটি রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এটি ঐতিহ্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করছে না, আবার তার পুনরাবৃত্তিও করছে না। বরং নতুন ভাষা, নতুন চিত্রকল্প, নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন বোধের মাধ্যমে কবিতা নিজস্ব এক সমকাল নির্মাণের চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / ধীরে এসো বসন্ত: অবেলায় বেজে ওঠা বেহালা
এ সময়ের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা; আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষা–নিরীক্ষার মধ্যেও গভীর মানবিকতা ও শিল্পসৌন্দর্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। নকিব মুকশি তার ঝিনুককবিতার মধ্য দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করেছেন ঠিক এভাবে—
‘মেঘের সঙ্গে বৃষ্টির সেপারেশন—
হৃদয়ে হৃদয়ে বেজে চলে
ভরা ভাদরের বিচ্ছেদের গান,
সেই বিরহের সুপেয় জলেই
পৃথিবী করে তার তৃষ্ণা নিবারণ।’
(সেপারেশন, পৃ: ৬৭)
কবির আরেকটি কবিতা ‘অন্তর্বাস’-এর মধ্যে দেখা যায়, গাছের আন্ডার গার্মেন্টস মূলত তার বাকল বা রক্ষাকবচের রূপক। এই আবরণ নষ্ট হলে গাছ তার শক্তি ও মর্যাদা হারায়; যে মাথা একদিন আকাশমুখী ছিল, তা একসময় কুঠারের আঘাতে নত হয়ে জ্বালানিতে পরিণত হয়। এখানে প্রকৃতির নিয়তি বিনয় ও ক্ষয়ের দিকে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে কবি সম্পূর্ণ বিপরীত সত্য দেখিয়েছেন। মানুষের অন্তর্বাস শুধুই পোশাক নয়; এটি সভ্যতা, শালীনতা, নৈতিকতা ও সামাজিক মুখোশের প্রতীক। এই মুখোশ সরে গেলে মানুষের প্রকৃত সত্তা উন্মোচিত হয়। তখন যে মানুষ বাইরে নম্র ও সংযত বলে মনে হতো, তার ভেতরের উদ্ধত প্রবৃত্তি, লুকানো কামনা, ক্ষমতার লালসা কিংবা আদিম তাড়না প্রকাশ পায়। ঝিনুককবিতার শক্তি তার এসব অভিনব রূপক, ব্যতিক্রমী শব্দপ্রয়োগ এবং অল্প পরিসরে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টির ক্ষমতায় নিহিত।
‘গাছের আন্ডার গার্মেন্টস খুলে গেলে
উদ্ধত শির হয় অবনত, হয়ে যায় জ্বালানি—
মানুষের অন্তর্বাস খুলে গেলে অবনত
হয় উদ্ধত, জাগে পাখি, অগস্ত্যর উসকানি’
(অন্তর্বাস, পৃ: ৯১)
‘ঝিনুকধানী’র শেষ কবিতায় আমরা দেখি প্রকৃতি ও জীবনের অনিবার্য সত্যতা। উদ্ধত মেঘ যেমন শেষ পর্যন্ত ধূলিতে ফিরে আসে, ঝরনাও অবশেষে সাগরের কাছে অবনত হয়। অর্থাৎ যত উঁচুতেই কেউ উঠুক না কেন, একসময় তাকে তার উৎস, সীমা কিংবা বৃহত্তর সত্যের কাছে নত হতেই হয়। মানুষও তা–ই। কবিতাটি অহংকারের ক্ষণস্থায়িত্ব আর বিনয়ের চিরন্তন মূল্যকে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে তুলে ধরেছে। কবিতাটা এ রকম—
‘উদ্ধত মেঘ
শেষে
ফিরে আসে
ধূলে—
ঝরনাও
অবনত হয়
সাগরে’
(অবশ্যম্ভাবী, পৃ: ৯৬)
কবিতার ধারাবাহিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর ইতিহাস মূলত দীর্ঘ আখ্যান থেকে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর শিল্প-অভিব্যক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার ইতিহাস। ঝিনুককবিতা সেই বিবর্তনেরই একটি নবতর অধ্যায়, যা সমকালীন পাঠকের মনোযোগ, দ্রুত পাঠাভ্যাস এবং গভীর নন্দন-অনুধাবনের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কবিতার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তবে ঝিনুককবিতার সাহিত্য-ঐতিহাসিক অবস্থান, নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং স্বতন্ত্র কাব্যতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / লা নুই বেঙ্গলী: ব্যর্থ প্রেমের অমর শোকগাথা
এসইউ








