সানফ্রান্সিসকোতে উৎসবের আবহ। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট কেটে ফেলেছে অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর গ্যালারি থেকে ড্রেসিংরুম, সবখানে এক তীব্র বিতর্ক। জয়োৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানের সেই লাল কার্ড নিয়ে!

ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ দিক। দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে নিলেন ফোলারিন বালোগান। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর তৃতীয় গোল। গ্যালারিতে তখন মার্কিন সমর্থকদের উন্মাদনা।

কিন্তু কে জানত, এই নায়কের কপালে ম্যাচের ৬৪ মিনিটে লেখা আছে ট্র্যাজেডি! বসনিয়ার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে বল দখলের এক লড়াইয়ের পর রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নাটকের শুরু এরপর।

ভিএআরের ইশারায় ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস মনিটরের সামনে গেলেন এবং ফিরে এসে পকেট থেকে বের করলেন সরাসরি লাল কার্ড।  রিপ্লেতে দেখা যায়, বল ক্লিয়ার করার সময় বালোগানের বুট প্রতিপক্ষের গোড়ালির পেছনে লেগেছিল।

স্বাভাবিক গতিতে দেখলে যা ছিল নিতান্তই বল দখলের একটা চেষ্টা, স্থির চিত্রে বা স্লো-মোশনে সেটাই হয়ে উঠল এক ‘ভয়াবহ অপরাধ’।

এই এক লাল কার্ডে বালোগানের নাম উঠে গেল বিশ্বকাপের এক অদ্ভুত ও বিরল ইতিহাসের পাতায়। নকআউট পর্বে গোল করার পর লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার এক ছোট্ট তালিকায় নাম উঠে গেল তাঁর। যেখানে আগে থেকেই বসে আছেন গারিঞ্চা, রোনালদিনিও আর জিনেদিন জিদানের মতো মহাতারকারা! ১৯৬২ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে জোড়া গোল করার পর লাল কার্ড দেখেন ব্রাজিলের গারিঞ্চা।

২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য জয়সূচক গোলের ঠিক ৭ মিনিট পর মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ব্রাজিলের রোনালদিনিওকে।

আর ২০০৬ সালের সেই বিখ্যাত ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে গোল করার পর অতিরিক্ত সময়ে মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুঁস মেরে জিনেদিন জিদানের বিদায় তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। বালোগান চলতি বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখা ১২তম খেলোয়াড়।

গোলও করেছেন বালোগান

ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেসিংরুমে ক্ষোভের আগুন। প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনো সংবাদ সম্মেলনে এসে সেই ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেননি, ‘এটি কোনোভাবেই লাল কার্ড ছিল না। টিভিতে দেখে স্পষ্ট বোঝা গেছে, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে ইচ্ছাকৃতভাবে মাড়িয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। ফুটবলে এটি একটি সাধারণ ঘটনা। এটি দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে। আর এই কারণেই আমার কাছে মনে হয়েছে এটি কখনোই লাল কার্ড হতে পারে না।’

ফিফার নিয়ম বলে, সরাসরি লাল কার্ডের পর পরবর্তী ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকর হবে এবং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করার সুযোগ নেই। নকআউটের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ভরসাকে ছাড়াই নামতে হবে পচেত্তিনোকে।

বিতর্কটা আরও উসকে দিয়েছেন ধারাভাষ্যকারেরা। বিশেষ করে লিওনেল মেসির প্রসঙ্গ টেনে ফুটবল আইনের দ্বিমুখী নীতি ও ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক একই ধরনের একটা ট্যাকল করেছিলেন মেসি, কিন্তু সেখানে ভিএআর রেফারিকে মনিটর দেখতেও ডাকেনি! বিবিসির স্টুডিওতে বসে ফার্ডিনান্ড ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন, ‘সবাই নিয়মের একই প্রয়োগ দেখতে চায়।

সেনেগাল দলে ঝামেলা: কোচের ওপর রাগ করে অবসর নিলেন পাপে গেয়ে

আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির সেই ট্যাকল আমাদের সবার মনে আছে। অনেকেরই ধারণা, ওটা সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ ছিল, অথচ সেটি ঠিকঠাক খতিয়ে দেখা হলো না, কোনো শাস্তিও দেওয়া হলো না। আর এখন বালোগানের ট্যাকলটা দেখুন, ভিএআর মাঝে নাক গলাল, রেফারি মনিটর দেখতে গেলেন এবং আচমকাই সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দেওয়া হলো। এই যে আলাদা নিয়ম, এটাই খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করে।’

একই সুরে কথা বলেছেন ইংল্যান্ড নারী ফুটবল দলের সাবেক স্ট্রাইকার সু স্মিথও, ‘রিপ্লে দেখার সময় ফ্রেমটা যখন আটকে রাখা হয়, তখন আপনার মনে হতেই পারে, এটা শতভাগ লাল কার্ড পাওয়ার মতোই অপরাধ। কিন্তু স্বাভাবিক গতিতে দেখলে সিদ্ধান্তটা বড্ড বেশি কঠোর মনে হবে। দুর্ভাগ্যবশত তার পা-টা ভুল জায়গায় পড়ে গেছে।’

ধারাভাষ্য কক্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফরোয়ার্ড ক্লিন্ট ডেম্পসি তো সোজাসাপটা বললেন, ‘আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে বড্ড বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বালোগান এমন কোনো অপরাধ করেনি, যার জন্য ওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে হবে। এত বড় একটা ম্যাচে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, যা পরে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।’

পেলে–রোনালদোকে ছাড়ানো কেইনের সামনে এখন মেসি