জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও গুরুতর আহত যোদ্ধাদের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তাদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন।
গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি আগস্টের শেষ সপ্তাহ অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা উদ্বোধন করবেন বলে আমরা আশা করছি।’
নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় ১৪টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব ভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আবাসন নিশ্চিত করা শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য একটি বড় সহায়তা হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগী পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ হবে। এই প্রকল্প শুধু একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি জাতির পক্ষ থেকে জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা আত্মত্যাগ করেছেন কিংবা গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের অবদান জাতি কখনো ভুলবে না। তাদের এবং তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই এই আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ‘এটি তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে কোনো প্রতিদান নয়। তাদের অবদানের মূল্য কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার একটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে আমরা তাদের জন্য স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করছি।’
তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিয়মিত ভাতা প্রদান, চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবেও তাদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। আমার নিজ জেলা পিরোজপুরে যারা নিহত বা আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করছি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, এই আন্দোলনকে শুধু জুলাই মাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিক পরিণতি।
আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব একদিনে হয়নি। এটি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে ৫ আগস্ট সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সৃষ্টি হয়।’
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের আন্দোলন এবং পরবর্তীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন লাভ করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের নির্যাতন, গুম, আয়না ঘর, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভোটাধিকার হরণের অভিযোগে ক্ষুব্ধ ছিল। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত একটি গণ-আন্দোলনের রূপ নেয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে।
সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণের কারণেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে জানিয়ে আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক এবং সংসদে আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে সরকার। এটিকে আমরা আমাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহল থেকে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা থাকলেও সরকার জুলাই সনদের মূল চেতনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের সরকারি স্বীকৃতির বিষয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার গেজেটভুক্ত নিহত ও গুরুতর আহতদের তালিকা অনুযায়ী তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, গেজেটভুক্ত নিহত ও আহতদের জন্য ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আবাসন প্রকল্পও সেই ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল যাতে আত্মত্যাগী পরিবারগুলোর কাছেও পৌঁছে যায়, সে বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি জাতির যে ঋণ, তা কখনো শোধ করার নয়। কিন্তু তাদের পরিবার যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে, সে জন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।








