জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে ‘মামলা ব্যবসায়ী’ হিসাবে পরিচিতি পাওয়া সাবেক বৈছাআ (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন) ও বর্তমানে জাতীয় ছাত্র শক্তি নেতা মারজুক আব্দুল্লাহর করা আরেকটি মামলার আবেদন নিয়ে বরিশালে এখন তোলপাড় চলছে। বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার ওই আবেদন করেন তিনি। আবেদনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৪৮ জনকে আসামি করা হলেও এদের মধ্যে ৪ জন মারা গেছেন বহু আগেই। এছাড়া কারাগারে আছেন ২নং অভিযুক্ত বরিশাল সদর আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ। জুন মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কথিত মিছিলে বাধা দিতে গেলে হামলা, বোমা-ককটেল বিস্ফোরণ আর অগ্নিসংযোগের অভিযোগে দায়ের করা এই মামলা নিয়ে হতবাক পুলিশ কর্মকর্তারাও। মামলার আবেদনে যে ৩টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার কিছুই ঘটেনি বলে জানিয়েছেন তারা। আদালতের বিচারক এসএম শরীয়তউল্লাহ অবশ্য মামলাটি সরাসরি আমলে না নিয়ে তদন্ত শেষে রিপোর্ট দিতে বলেছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনারকে। এদিকে মারজুক কী করে আদালতে গিয়ে মামলাটি করলেন তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা। ৫ আগস্টের পর পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় পুলিশের দায়ের করা একটি ডাকাতি চেষ্টা মামলার আসামি এই মারজুক। সেই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার পরও তিনি কিভাবে আদালতে গেলেন সেটাই প্রশ্ন।

জুলাই বিপ্লবের পর বৈছাআ’র সমন্বয়ক হিসাবে বরিশালে প্রভাব বিস্তার করেন মারজুক। সেসময় ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলা করে আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ১৪ মে দায়ের করা ওই মামলায় ২৪৭ জনকে আসামি করেছিলেন তিনি। বৈছাআ বিলুপ্ত হওয়ার পর জাতীয় ছাত্র শক্তিতে যোগ দেন। পরে তাকে সদ্য বিলুপ্ত মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। মাঝে কিছুদিন চুপ থাকার পর বৃহস্পতিবার আরেকটি মামলার আবেদন আদালতে জমা দেন মারজুক।

মামলার আবেদনে বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহসহ আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৪৮ নেতাকর্মীকে। এই তালিকায় একদিকে যেমন আছেন বেশ কয়েকজন মৃত ব্যক্তি, তেমনি রয়েছেন বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক এমপি জেবুন্নেসা আফরোজ। মামলার আবেদনে তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গত ১০, ১৬ ও ২২ জুন বরিশাল নগরীর এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিল, টায়ার-যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এইসব নেতাকর্মী সশস্ত্র মিছিল নিয়ে বের হলে বাধা দেন মারজুকসহ অন্যরা। এ সময় আসামিরা তাদের লক্ষ্য করে বোমা ককটেল ছুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এরমধ্যে একটি মিছিল টানা ২২ মিনিট ধরে চলে দাবি করে মারজুক বলেন, ‘আসামিদের সশস্ত্র হামলা ও বোমা ককটেল বিস্ফোরণে পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ও বেশ কয়েকজন আহত হয়।’

আদালতে জমা দেওয়া এই আবেদন যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, ঘটনার যেসব তারিখ বলা হয়েছে তখন কারাগারে ছিলেন সাবেক এমপি জেবুন্নেসা। এখনো কারাগারেই আছেন তিনি। আসামির তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে ৪ জন অনেক আগে মারা গেছেন। ২১২ নম্বরে থাকা খন্দকার রেজাউর মারা গেছেন ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। ১৯৫ ও ২২৫ নম্বরে থাকা আলী হাওলাদার এবং হাফিজুর রশিদ মারা গেছেন ২০২১ সালের ২৬ জুলাই ও ১৯ অক্টোবর। ১৯৮ নম্বরে নাম থাকা আবুল ফারুকের মৃত্যু হয়েছে ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। মৃত এইসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে মিছিল করা, অস্ত্র বহন ও বোমা-ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ। এছাড়া তালিকায় এমন অনেকের নাম রয়েছে যারা কখনোই জড়িত ছিলেন না আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডে। নগরীর পরিচিত পরিবারের সদস্য কাজী আফরোজার নাম রয়েছে এই তালিকার ৫১ নম্বরে। যুগান্তরকে কাজী আফরোজা বলেন, ‘মামলার কাগজ সাজিয়ে আমার কাছে লোক পাঠানো হয়েছিল। মোটা অংকের টাকা দিলে মামলায় নাম থাকবে না বলা হয় আমাকে। যেহেতু আমি আওয়ামী লীগ করি না এবং আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডেও থাকিনি তাই স্বাভাবিকভাবেই টাকা দেইনি তাদের। এখন তো দেখি আমার নাম আসামির তালিকায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ আসামির তালিকায় নাম থাকা আরও কয়েকজন একই ধরনের তথ্য জানান এই প্রতিবেদককে।

এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুমন কুমার বলেন, ‘২২ মিনিট তো দূরের কথা ২ মিনিটের একটি মিছিলও হয়নি আমার এলাকায়। সেখানে বোমা ককটেল বিস্ফোরণ তো পুরোপুরি মিথ্যা।’ বরিশালের পুলিশ কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘বোমা-ককটেল ফাটিয়ে মিছিল হলে আমি যেমন জানতাম তেমনি আপনারাও জানতেন। তাছাড়া অগ্নিসংযোগের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। আদালত যেহেতু তদন্তে দিয়েছেন, আমরা সঠিক রিপোর্টই দাখিল করব।’ এদিকে মারজুক আব্দুল্লাহ নিজেও ডাকাতি চেষ্টা মামলার একজন পলাতক আসামি। ২০২৫ সালের ৬ জুন ওই মামলাটি দায়ের হয় পটুয়াখালী জেলার দুমকি থানায়। মামলার অপর দুই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেও মারজুকের নাম রয়েছে পলাতকের তালিকায়। এসব বিষয় নিয়ে আলাপকালে মারজুক বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নগরীতে মিছিল সন্ত্রাস করেছে। তারা বোমা ফাটিয়েছে, ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আমি ও আমার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। এসব কারণেই মামলা করেছি।’ আসামির তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের বক্তব্য অনুযায়ী আসামির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কোনো ভুল থাকলে পরবর্তিতে সংশোধন করা হবে।’